নাটোরে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহতদের ৯ জনের পরিচয় শনাক্ত, এক উপজেলারই ৫ জন
নাটোরের বড়াইগ্রামে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ১৪ জনের মধ্যে ৯ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে পাঁচজনই শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার বাসিন্দা — একই উপজেলার পাঁচজনের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুতে জাজিরাজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া, পরিবারগুলোতে চলছে মাতম।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে নাটোর-পাবনা মহাসড়কের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি এলাকার সরকার পাড়ায় দুর্ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, বরগুনা থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী আরপি পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে বিপরীত দিক থেকে আসা বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।
সংঘর্ষে ঘটনাস্থলেই ১০ জন নিহত হন। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর আরও চারজনের মৃত্যু হয় — মোট মৃত্যু দাঁড়ায় ১৪ জনে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩০ জন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতাল, নাটোর সদর হাসপাতাল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
শনাক্ত হওয়া জাজিরার পাঁচজন হলেন — রামকৃষ্ণপুর মাদবরকান্দি এলাকার জহির উদ্দিন মাদবরের ছেলে জুয়েল মাদবর, ডুবিসায়বর মোল্যাকান্দি এলাকার জাহান উদ্দিন মোল্যার ছেলে সালাল মোল্যা, ডুবিসায়বর কাজিরহাট এলাকার ইউনুস শিকদারের ছেলে সোহাগ শিকদার, কাজিরহাট এলাকার সামাদ ফকির এবং পালেরচর এলাকার শাহিন। তারা ব্যবসায়িক কাজে নাটোরে গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।
একই উপজেলার পাঁচজনের মৃত্যুর খবরে জাজিরার পরিবারগুলোতে শোকের মাতম চলছে। প্রিয়জনদের হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন স্বজনেরা; পুরো এলাকায় বিরাজ করছে শোকাবহ পরিবেশ। খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই নিহতদের বাড়িতে ভিড় করছেন প্রতিবেশী ও স্বজনেরা।
জাজিরা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সালেহ আহম্মদ বলেন, ‘আমরা বিষয়টি ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি। খোঁজখবর নিয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাতে পারব।’ স্থানীয় পুলিশের পক্ষ থেকে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ও তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলছে বলে তার বক্তব্যে ইঙ্গিত মিলেছে।
জাজিরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল ইমরান বলেন, ‘বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের সহযোগিতা করা হবে।’ অর্থাৎ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
এদিকে নাটোরের বনপাড়ায় বাস-ট্রাক সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নাটোরের বনপাড়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১৪ জনের মৃত্যু ও অন্তত ২০ জনের আহত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। তিনি নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন, আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন এবং হতাহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার আহতদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে সহযোগিতা দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান তিনি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল সড়ক নিরাপত্তার বৃহত্তর প্রশ্নটিও তুলেছেন। তিনি বলেন, দেশের সড়ক ও মহাসড়কগুলোতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ত্রুটির কারণে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি রোধে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, অদক্ষ চালকদের গাড়ি চালানো বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের চলাচল বন্ধের দাবি জানান তিনি। সড়ক সিন্ডিকেট ভেঙে নাগরিকদের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতিও আহ্বান জানান তিনি।
ভোরের এই দুর্ঘটনা আবারও তুলে ধরেছে মহাসড়কে মুখোমুখি সংঘর্ষের ভয়াবহতা। ঘুমভাঙা ভোরে যাত্রীবাহী বাস ও বালুবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে একসঙ্গে এত প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঘটনা সড়ক ব্যবস্থাপনা, যানবাহনের ফিটনেস ও চালকদের দক্ষতা নিয়ে প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে — যেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে বলেই মত রাজনৈতিক দল থেকে সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সবার।
এখন বাকি নিহতদের পরিচয় শনাক্ত, আহতদের চিকিৎসা এবং দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানই প্রধান কাজ। জাজিরাসহ নিহতদের এলাকাগুলোতে শোকের আবহের মধ্যে পরিবারগুলো অপেক্ষা করছে স্বজনদের মরদেহের জন্য; আর আহত অন্তত ৩০ জনের চিকিৎসা চলছে বিভিন্ন হাসপাতালে। এই দুর্ঘটনার তদন্তে কী বেরিয়ে আসে, সেদিকেই এখন সবার নজর।



