প্রমাণ নিয়ে সন্দেহে মৃত্যুদণ্ড রদ করলেন আলাবামার গভর্নর, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেলেন টোফরেস্ট জনসন
যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত এক বন্দির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে রূপ দিয়েছেন গভর্নর কে আইভি। মঙ্গলবার নেওয়া এই সিদ্ধান্তে টোফরেস্ট জনসনের মৃত্যুদণ্ড বদলে প্যারোল ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড করা হয়েছে। ১৯৯৫ সালে জেফারসন কাউন্টির ডেপুটি শেরিফ উইলিয়াম হার্ডিকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন জনসন, তবে তিনি দীর্ঘদিন ধরেই নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করে আসছেন।
গভর্নর আইভি এক বিবৃতিতে বলেছেন, জনসনের মামলাটি সামনে আসার পর তাঁর মনে হয়েছে, মৃত্যুর মতো সবচেয়ে গুরুতর শাস্তি কার্যকর করার জন্য যথেষ্ট প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছিল না। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত নির্দোষ ঘোষণা নয়; বরং মামলার পরিস্থিতি বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে প্যারোলবিহীন যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়াই যুক্তিযুক্ত বলে তিনি মনে করেছেন। জনসন এখনো হলম্যান কারেকশনাল ফ্যাসিলিটিতে বন্দি রয়েছেন।
সাজা কমানোর এই সিদ্ধান্তের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বর্তমান জেফারসন কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি এবং কয়েকজন সাবেক বিচারক ও প্রসিকিউটরের উদ্বেগ। তাঁরা জনসনের দোষী সাব্যস্ত হওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। অন্যদিকে আলাবামার অ্যাটর্নি জেনারেল স্টিভ মার্শাল গত সপ্তাহে গভর্নরের কাছে ক্ষমার আবেদন প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং জুরির সিদ্ধান্ত ও পর্যালোচনাকারী আদালতগুলোর রায়কে সম্মান জানাতে বলেছিলেন। সেই আহ্বান সত্ত্বেও গভর্নর প্রাণ বাঁচানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৯৫ সালের ১৯ জুলাই। বার্মিংহামের একটি হোটেলের বাইরে ডিউটির বাইরে নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের সময় ডেপুটি শেরিফ হার্ডির মাথায় দুবার গুলি করা হয়। জনসনের বক্তব্য, গুলির ঘটনার সময় তিনি শহরের অন্য প্রান্তে ছিলেন। এই অবস্থানের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষী রয়েছেন বলেও তাঁর সমর্থকেরা বলে আসছেন।
জনসনের আইনজীবী টাই আলপার বলেছেন, গভর্নর মনোযোগ দিয়ে মামলাটি পর্যালোচনা করে একজন নির্দোষ মানুষকে মৃত্যুদণ্ড থেকে বাঁচাতে পদক্ষেপ নিয়েছেন বলে তিনি ও তাঁর মক্কেল কৃতজ্ঞ। তবে লড়াই এখানেই শেষ হচ্ছে না। আলপারের ভাষায়, জনসন নির্দোষ, এখন আদালতের কাজ হলো তাঁর দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বাতিল করে নতুন বিচারের সুযোগ দেওয়া, এবং সেই লড়াই চলবে যতদিন না তিনি পরিবারের কাছে ফিরতে পারছেন।
মামলার সবচেয়ে বিতর্কিত অংশটি একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রসিকিউশন সাক্ষীকে ঘিরে। ১৯৯৮ সালের বিচারে ওই নারী সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তিনি একটি থ্রি-ওয়ে ফোনকলে আড়ি পেতে শুনেছিলেন যে জনসন বলে মনে হওয়া একজন হত্যার কথা স্বীকার করছেন। পরে জানা যায়, মামলায় সহায়তার জন্য ২০০১ সালে তিনি পাঁচ হাজার ডলার পুরস্কার পেয়েছিলেন। জনসনের আইনজীবীদের অভিযোগ, তাঁর সাক্ষ্যের পেছনে অর্থের প্রণোদনা থাকার তথ্য রাষ্ট্রপক্ষ গোপন রেখেছিল।
২০১৮ সালে নির্বাচিত জেফারসন কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি ড্যানি কারও নতুন বিচারের দাবির পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। ২০২৪ সালে আদালতে দেওয়া এক নথিতে তিনি লিখেছিলেন, বিশ বছরে এই মামলার প্রমাণ ভেঙে পড়েছে। তাঁর মতে, গুলির সময় জনসন অন্য এলাকায় ছিলেন বলে বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষীরা বলছেন, এবং প্রধান সাক্ষীর বক্তব্য নিয়েও সন্দেহের একাধিক কারণ রয়েছে।
নতুন বিচারের পক্ষে সমর্থন এসেছে আরও অনেক দিক থেকে। সাবেক আলাবামা অ্যাটর্নি জেনারেল বিল ব্যাক্সলি, আলাবামা সুপ্রিম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি সনি হর্নসবি ও ড্রেটন নেবার্সসহ একাধিক সাবেক বিচারক ও প্রসিকিউটর নতুন বিচারের পক্ষে আদালতে নথি জমা দিয়েছেন বা সম্পাদকীয় লিখেছেন। এমনকি জনসনের মামলার মূল প্রসিকিউটরসহ বিশিষ্ট আইনজীবীরাও এই দাবির পাশে এসেছেন বলে তাঁর সমর্থকেরা জানিয়েছেন, আর বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ে মনোযোগ পেয়েছে।
গভর্নর আইভির জন্য এ ধরনের সিদ্ধান্ত নতুন নয়। ২০১৭ সালে গভর্নর হওয়ার পর থেকে তিনি তিনজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সাজা কমিয়েছেন। একই সময়ে তাঁর মেয়াদে ২৭টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। মেয়াদ শেষ হয়ে আসায় তিনি আর নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না, আগামী জানুয়ারিতে তাঁর মেয়াদ শেষ হবে।
সাজা কমে যাওয়ায় জনসনের প্রাণ বেঁচে গেলেও তাঁর মুক্তির প্রশ্নটি এখনো আদালতের ওপর নির্ভর করছে। আইনজীবীরা বলছেন, দোষী সাব্যস্ত হওয়ার রায় বাতিল ও নতুন বিচারের জন্য তাঁদের দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই চলবে। গভর্নরের সিদ্ধান্ত সেই লড়াইয়ে একটি বড় মোড় হলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়।





