ট্রাম্পের ‘মাদার অব অল বম্বস’ হুমকি: ইরানের গভীর বাংকার কি এবার লক্ষ্যে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মাদার অব অল বম্বস’ (এমওএবি) নিয়ে হুমকিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়ার কথা বলছেন বিশ্লেষকেরা। মার্কিন বিমানবাহিনীর জিবিইউ-৪৩ ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট অস্ত্রটি ইরানকে লক্ষ্য করে নতুন কোনো বিমান হামলার পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ট্রাম্প বলেছেন, ‘মাদার অব অল বম্বস পারমাণবিক নয়। এটি শুধুই অত্যন্ত বড় একটি বোমা। এটি যেন ছোটখাটো একটি পারমাণবিক বোমা, কিন্তু মাদার অব অল বম্বস একটি বড় বোমা, তবে তা পারমাণবিক নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি পারমাণবিক ব্যবহার করব না। আমাদের তা করার দরকার নেই।’
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, ট্রাম্পের বক্তব্য ঠিক: যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন নির্ভুল অস্ত্রের ভান্ডার রয়েছে, যা ইরানের যেকোনো সন্দেহজনক স্থাপনায় আঘাত হানতে পারে—এর মধ্যে পিক্যাক্স পর্বতে চলমান নির্মাণকাজও রয়েছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল ব্র্যাডলি কুপারের কাছে ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডের উচ্চমূল্যের স্থাপনাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান রয়েছে, যেগুলো এমওএবির সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে।
ট্রাম্প বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের (মিডটার্ম) আগে তিনি ইরানে হামলা চালাবেন না। তবে স্পষ্টতই তিনি সেন্ট্রাল কমান্ডের হামলার ব্রিফিং চার্টগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছেন—এবং তিনি চান, ইরানও তা জানুক।
এমওএবি প্রথম ব্যবহৃত হয়েছিল ট্রাম্পের নির্দেশেই, ২০১৭ সালের এপ্রিলে আফগানিস্তানে। ১৩ এপ্রিল ২০১৭ সালে নানগারহার প্রদেশের একটি গুহা কমপ্লেক্সে বোমাটি ফেলা হয়। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস বলেছিলেন, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই; যুদ্ধ চলছিল এবং আইএসআইএসকে ভাঙতে যা প্রয়োজন, তা-ই ব্যবহার করা হবে। সিএনএন তখন ৯৪ জন আইএস যোদ্ধা নিহত হওয়ার খবর দিয়েছিল।
বোমাটির ওজন ২১ হাজার পাউন্ড। যুক্তরাষ্ট্রের বি-২, বি-৫২ ও বি-১ বোমারু বিমান ওজন বইতে পারলেও আকৃতির কারণে বোমাটি বোমারু বিমানের সাধারণ র্যাক ও রোটারি লঞ্চারে বসে না। ২০১৭ সালের অভিযানে এটি বিশেষ ক্র্যাডলে বসিয়ে এমসি-১৩০ বিমানের পেছনের র্যাম্প দিয়ে বের করে ফেলা হয়েছিল।
এমসি-১৩০ বিশেষ অভিযানের জন্য অভিযোজিত বিমান। ইরানের আকাশে আধিপত্য থাকলে এমন অভিযান সহজ হয়। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র প্রাথমিক সপ্তাহগুলোতে ইরানের রুশ-নির্মিত সমন্বিত আকাশ প্রতিরক্ষা ধ্বংস করা হয়েছিল এবং পরবর্তী হামলায় সেন্টকম ইরানকে তা পুনর্গঠন করতে দেয়নি। এমওএবি অভিযানে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও আক্রমণ দমনে স্পেস ফোর্স, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর বাহক-ভিত্তিক বিমানও সহায়তা করতে পারে।
বোমাটির সরকারি নাম জিবিইউ-৪৩, যার অর্থ গাইডেড বম্ব ইউনিট। ছাড়ার পর ছোট ড্রোগ প্যারাশুট এটিকে স্থিতিশীল রাখে এবং স্যাটেলাইট-নির্দেশনা কিট এটিকে নির্ধারিত লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। এমওএবি আসলে বাতাসে বিস্ফোরিত হয়; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও ভিয়েতনাম যুদ্ধে ব্যবহৃত ছোট ভারী এয়ার ব্লাস্ট অস্ত্রগুলোর ধারাবাহিকতায় এর নকশা, যাতে ভূমিতে বিস্ফোরণের ধাক্কা আটকে না গিয়ে আঘাতের প্রভাব সর্বোচ্চ হয়।
বোমাটি তৈরি করা হয়েছিল ২০০৩ সালে ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’-এর ঠিক আগে তড়িঘড়ি করে, বিমানবাহিনীর গবেষণা ল্যাবরেটরিতে। তখন ধারণা ছিল, ইরাকের সাদ্দাম হুসেইনের অনুগত বাহিনীর জন্য বড় ভূগর্ভস্থ বাংকার তৈরি হয়ে থাকতে পারে। ‘মাদার অব অল’ নামটির পেছনেও রয়েছে ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় সাদ্দামের ‘সব যুদ্ধের মা’ হুমকির প্রসঙ্গ।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এমওএবি প্রসঙ্গ তোলার উদ্দেশ্য হলো ইরানি রেভল্যুশনারি গার্ডের ওপর সামরিক চাপ বজায় রাখা, যখন মার্কিন নৌ অবরোধ তাদের তেলের আয় চেপে ধরছে। এমওএবি সামরিক লক্ষ্য ধ্বংসের ভীতি সঞ্চারক অস্ত্র হিসেবে কাজ করবে এবং গার্ড কমান্ডারদের বড় ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে।
একই সঙ্গে এটি একটি স্মরণবার্তা যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির পথ বন্ধ করতে ও সন্ত্রাসবাদ থামাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজন মনে করলে যেকোনো সামরিক হামলা চালাতে সক্ষম। তবে হুমকি আর প্রকৃত হামলার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে; মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে হামলা না করার ট্রাম্পের নিজের বক্তব্যই সেই হিসাবের অংশ।
ফলে আপাতত এমওএবি একটি চাপের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে—শব্দে বড়, বাস্তবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে ইরানের পরবর্তী পদক্ষেপ ও ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক হিসাবের ওপর।





