ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে বিদেশি নেতাদের মন্তব্যকে ‘বোকামি’ বললেন মাখোঁ
ফ্রান্সের সড়ক অস্থিরতা নিয়ে বিদেশি নেতাদের মন্তব্যকে ‘অগ্রহণযোগ্য ও বোকামি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। দেশটি যখন এই সপ্তাহান্তে আরও বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
কাতার সফরের সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মাখোঁ কারও নাম সরাসরি নেননি। তবে তিনি বলেন, শনিবারের দাঙ্গার পর ‘তথ্যের কারসাজি’ ঘটেছে এবং তার জেরে ‘অনেকের কাছ থেকে, বিদেশি নেতাদের কাছ থেকেও’ এমন মন্তব্য এসেছে যা ‘যতটা অগ্রহণযোগ্য, ততটাই বোকামি’।
তিনি কি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথা বলছেন—এমন প্রশ্নে মাখোঁর জবাব ছিল, ‘অন্যদের মধ্যে তিনিও আছেন।’ মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান দলের হয়ে প্রচারে থাকা ট্রাম্প ফ্রান্সের সহিংসতার জন্য ‘অভিবাসী, জিহাদি ও কমিউনিস্টদের’ দায়ী করেছেন।
দোহায় সাংবাদিকদের মাখোঁ বলেন, নির্বাচনী প্রচারের মাঝখানে থাকা কিছু নেতা—এই অঞ্চলে হোক বা আটলান্টিকের ওপারে—‘নির্দিষ্ট মহল যে বয়ান ছড়াতে চাইছে, তা সরলভাবে ছড়িয়ে দিচ্ছেন’। তাঁর ভাষায়, ‘তারা নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারে আমাদের দেশকে ব্যবহার করছেন। আমাদের এটা দরকার নেই। আমাদের নিজেদেরই যথেষ্ট সমস্যা সামলাতে হচ্ছে।’
ফরাসি প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি ঘুরছে, যাতে ‘ফ্রান্সে কখনোই ঘটেনি এমন দৃশ্য’ দেখানো হচ্ছে। ‘আমাদের বলা হচ্ছে, অভিবাসী ও ইসলামপন্থিদের ভিড়ে আমরা আক্রান্ত হয়েছি—এটা সম্পূর্ণ ভুয়া,’ বলেন তিনি।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও মন্তব্য করেছেন, ফ্রান্স ‘চরমপন্থি ইসলামের আগ্রাসনের’ শিকার হয়েছে। আগামী সপ্তাহান্তে তাঁর নিজেরও নির্বাচন। তবে বিশ্লেষকেরা ফ্রান্সের বিক্ষোভের মূল কারণ হিসেবে অভিবাসীদের দায়ী করার দাবি উড়িয়ে দিয়েছেন।
মাখোঁ ও তাঁর সরকার এমন এক সংকট সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন, যা তাঁর উত্তরসূরি বেছে নেওয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ছয় মাস আগে ফেটে পড়েছে। শনিবারের ব্যাপক দাঙ্গার ওপর সরকার ‘নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল’ বলে নিজেরাই স্বীকার করেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মূলত শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দ্রুত ব্যাপক সহিংসতা ও লুটপাটে রূপ নেয়, বিশেষ করে প্যারিস, মার্সেই, লিয়ঁ ও লিমোজে। লিমোজে টাউন হলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় এবং তা আংশিক পুড়ে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার প্যারিসের কিছু অংশে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ থাকবে, কারণ শহরটি আরও মিছিলের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
অস্থিরতার জেরে বেশ কয়েকটি দেশ ফ্রান্স ভ্রমণের সতর্কতা জারি করেছে এবং ইতিমধ্যে অস্থির আর্থিক বাজার আরও নার্ভাস হয়ে পড়েছে। বুধবার ফরাসি সরকারের ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ।
মাখোঁ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, গত সপ্তাহান্তের মতো পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে দেওয়া হবে না। ইয়েলো ভেস্ট বা ‘হলুদ জ্যাকেট’ তৃণমূল আন্দোলন শনিবার প্যারিসের কেন্দ্র দিয়ে মিছিলের পরিকল্পনা আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দিয়েছে—যা সরকারের পরবর্তী বড় পরীক্ষা হতে পারে। একই দিনে শিক্ষায় বেশি বিনিয়োগের দাবিতে ছাত্র সংগঠনগুলোও বিক্ষোভ ডেকেছে।
সরকারের মন্ত্রীরা গত সপ্তাহান্তের প্রাথমিক সাড়ার ঘাটতি স্বীকার করে এবার ‘বিশাল’ ও জোরদার নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন; পুলিশের পাশাপাশি কিছু সেনা সদস্যও মোতায়েন করা হতে পারে। সোম ও মঙ্গলবার প্যারিস, মার্সেই ও লিলসহ বিভিন্ন শহরে আংশিক রাতের কারফিউ অপেক্ষাকৃত শান্তি ফিরিয়ে এনেছে এবং বুধবারেও তা নবায়ন করা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে ফ্রান্সের প্রধান শ্রমিক সংগঠনগুলো ৫ নভেম্বর দেশব্যাপী সমাবেশের ডাক দিয়েছে। সিজিটি ইউনিয়নের প্রধান সোফি বিনে বলেছেন, ‘প্রচণ্ড ও ন্যায্য ক্ষোভ আছে, আর এই পরিস্থিতির জবাব দমন-পীড়ন নয়; জবাব হতে হবে রাজনৈতিক।’ বুধবার ইউনিয়ন প্রতিনিধিরা প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকোর্নুর সঙ্গে বৈঠক করলেও সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। মাখোঁ জোর দিয়ে বলেছেন, ফ্রান্সের ‘জরুরি অবস্থার দরকার নেই’ এবং ‘যেকোনো অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য দেশটির আছে’। ইতালি ও বেলজিয়ামসহ অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোতেও সহিংস বিক্ষোভ দেখা দেওয়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ পুরো মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা বাড়ছে; ইতালির সরকার মিলানের সড়ক সহিংসতা থামাতে ৫০০ সেনা মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছে।






