আত্মীয়ের মুখ চেয়ে সন্তানের নিরাপত্তায় আপস নয়: সীমারেখা টানার পরামর্শ মনোবিজ্ঞানীর
পরিবারের কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয় হয়তো আপনার সন্তানের সঙ্গে এমন আচরণ করেন, যা আপনার ভালো লাগে না। কেউ শিশুকে অপমান করেন, কেউ তার সামনে চিৎকার-চেঁচামে�চি করেন, আবার কেউ আপনার নিষেধ সত্ত্বেও এমন কিছু করতে দেন, যা সন্তানের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। কিন্তু তিনি পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য বলেই সরাসরি বাধা দিতে দ্বিধা হয় অনেক অভিভাবকের।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সন্তানকে আত্মীয়দের সঙ্গে পরিচিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ হলেও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য সন্তানের নিরাপত্তা ও স্বস্তিকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। পরিবারের কারও আচরণ ক্ষতিকর হলে, তার সঙ্গে সন্তানের মেলামেশার ক্ষেত্রে সীমারেখা টানা প্রয়োজন হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী ব্রিজেট পিটিট সম্প্রতি এক নিবন্ধে আলোচনা করেছেন, পরিবারের সমস্যাপূর্ণ সম্পর্কের প্রভাব থেকে সন্তানকে কীভাবে সুরক্ষিত রাখা যায় এবং কোন আত্মীয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা বা না রাখার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া যায়।
তাঁর প্রথম পরামর্শ — কোনো আত্মীয়ের আচরণ আপনার অপছন্দ হলেই তা সন্তানের জন্য বিপজ্জনক, এমন নয়। তাই সবার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন, ঠিক কোন বিষয়টি নিয়ে আপনি উদ্বিগ্ন। কারণটা পরিষ্কার না হলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন।
তবে বিষয়টি যদি শারীরিক নিরাপত্তা, মানসিক নির্যাতন, সহিংসতা, মাদক ব্যবহারের ঝুঁকি কিংবা শিশুর বয়সের অনুপযোগী কোনো আচরণের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখতেই হবে। সন্তানের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে থাকলে আত্মীয়তার সম্পর্কের চেয়ে তাকে সুরক্ষিত রাখাই বেশি জরুরি।
অন্যদিকে, সন্তানের ঘুমের সময়, খাবার, স্ক্রিন ব্যবহারের নিয়ম কিংবা শাসন নিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতপার্থক্য হতেই পারে। কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে শিশু একটু বেশি সময় টেলিভিশন দেখল বা স্বাভাবিকের চেয়ে দেরিতে ঘুমাল — এমন ঘটনা সবসময় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ইঙ্গিত দেয় না।
তাই সব ক্ষেত্রে সম্পর্ক ছিন্ন করার মতো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রয়োজন নেই। পরিস্থিতি অনুযায়ী মাঝামাঝি সমাধান খোঁজা যায় — যেমন রাতে থাকার বদলে দিনের বেলায় আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, কিংবা সন্তানের সঙ্গে সময় কাটানোর ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম আগে থেকেই ঠিক করে দেওয়া।
কখনো পরিবারের কোনো সদস্য আপনার উদ্বেগ বুঝতে পারেন এবং নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলতে রাজি থাকেন। এমন কাউকে পাশে রাখা সহায়ক হতে পারে, যিনি প্রয়োজনে অন্য আত্মীয়ের আপত্তির মুখেও সন্তানের স্বার্থে আপনার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করবেন।
তবে শুধু মুখে সমর্থন করাই যথেষ্ট নয়। তিনি বাস্তবে সীমারেখা মেনে চলবেন কি না, শিশুর অস্বস্তি বুঝতে পারবেন কি না এবং সমস্যা দেখা দিলে আপনাকে জানাবেন কি না — সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে।
আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফেরার পর সন্তান কেমন অনুভব করছে, তা খেয়াল করার পরামর্শও দিয়েছেন মনোবিজ্ঞানী। সে কি আনন্দের সঙ্গে সময় কাটানোর কথা বলছে, নাকি ভয়, অস্বস্তি কিংবা অপমানের অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছে — এই পার্থক্যটাই অনেক কিছু বলে দেয়।
শিশু যদি বলে কেউ তাকে ভয় দেখিয়েছেন, জোর করেছেন কিংবা কোনো ঘটনা গোপন রাখতে বলেছেন, তাহলে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন। তাকে দোষারোপ করবেন না, কথা বলার জন্য চাপও দেবেন না। প্রয়োজন হলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পেশাদার সহায়তা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সন্তানের অভিজ্ঞতা আপনার নিজের শৈশবের অভিজ্ঞতার মতো নাও হতে পারে। অতীতে সমস্যাপূর্ণ আচরণ করেছেন এমন কোনো আত্মীয় সময়ের সঙ্গে বদলে যেতে পারেন; আবার কারও আচরণ একই রকম থেকে যেতে পারে। তাই অতীতের ধারণা নয়, বর্তমান পরিস্থিতি ও সন্তানের অভিজ্ঞতাই বিবেচনার ভিত্তি হওয়া উচিত।
প্রত্যেক আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ধরন এক হতে হবে না। কারও সঙ্গে নিয়মিত দেখা করা যেতে পারে, কারও সঙ্গে দেখা করার সময় অভিভাবকের উপস্থিতি প্রয়োজন হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে যোগাযোগ সীমিত বা বন্ধ রাখাও জরুরি হতে পারে।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তের দায়িত্ব অভিভাবকেরই — সন্তান কার সঙ্গে, কতক্ষণ এবং কোন পরিস্থিতিতে সময় কাটাবে। আত্মীয়দের মতামত শোনা যেতে পারে, কিন্তু সন্তানের নিরাপত্তার প্রশ্নে নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। পরিবারের সবাই সিদ্ধান্তে খুশি হবেন, এমন নিশ্চয়তা নেই; তবু যুক্তিসংগত সীমারেখা বজায় রাখাই সন্তানকে শুধু বর্তমানের ক্ষতি থেকে রক্ষা করে না, তাকে নিজের অস্বস্তি প্রকাশ করা ও সুস্থ সম্পর্ক চেনার শিক্ষাও দেয়।






