মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে আইসিই এজেন্টদের ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে গভীর উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই) এজেন্টরা কোনো ভূমিকা রাখবে কি না, তা নিয়ে গণতন্ত্রপন্থী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের আশঙ্কা, ভোটের দিনে এই সংস্থার উপস্থিতি ভোটারদের ভোটদানে প্রভাব ফেলতে পারে।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটির অনথিভুক্ত অভিবাসীদের খুঁজে বের করে বিতাড়নের অভিযান শুরু করেছেন। সেই অভিযানের নেতৃত্বে রয়েছে আইসিই, যা হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের অধীন একটি ফেডারেল সংস্থা।
ট্রাম্পের অধীনে সংস্থাটি উল্লেখযোগ্যভাবে বড় হয়েছে। জানুয়ারি পর্যন্ত এর কর্মকর্তা ও এজেন্টের সংখ্যা ২২ হাজার, যা ১২০ শতাংশ কর্মী বৃদ্ধি। সাম্প্রতিক ব্যয় প্যাকেজগুলোর কারণে আইসিইকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি অর্থায়ন পাওয়া ফেডারেল আইন প্রয়োগকারী সংস্থা হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটি তার আগ্রাসী কৌশল ও দ্রুত নিয়োগ পদ্ধতির কারণে বেড়ে চলা নজরদারির মুখে পড়েছে। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে অভিবাসন এজেন্টরা অন্তত ২৫টি গুলির ঘটনার জন্য দায়ী, যার ছয়টি ছিল প্রাণঘাতী। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আইসিই হেফাজতে অন্তত ৬০ জনের মৃত্যুও হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এই রেকর্ডই ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে আইসিইর তৎপরতা নিয়ে গণতন্ত্রের পক্ষের কর্মী ও মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়নের (এসিএলইউ) মতো সংগঠন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে ট্রাম্প প্রশাসন ভোটারদের ভয় দেখাতে আইসিইকে ব্যবহার করতে পারে।
গোষ্ঠীগুলো বলছে, আইসিই এজেন্টদের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কাই কিছু ভোটারকে ব্যালট বাক্স থেকে দূরে রাখতে পারে। সেপ্টেম্বরে ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, সান ডিয়েগোর করা একটি জাতীয় জরিপে দেখা গেছে, ৪০ শতাংশ উত্তরদাতা আশা করছেন ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রের কাছে আইসিই এজেন্টরা উপস্থিত থাকবেন।
ফেডারেল আইন ভোটকেন্দ্রে সশস্ত্র ফেডারেল এজেন্টদের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে। কিছু অঙ্গরাজ্যেও একই ধরনের বিধান রয়েছে। এই ফেডারেল নিষেধাজ্ঞার ইতিহাস ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত যায়; আইনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক, সামরিক বা নৌসেবায় নিযুক্ত কেউ নির্বাচনের জায়গায় কোনো সৈন্য বা সশস্ত্র লোক আনার নির্দেশ দিতে বা আনতে পারবে না। তবে ভোটকেন্দ্রে শান্তি রক্ষা বা যুক্তরাষ্ট্রের সশস্ত্র শত্রুদের প্রতিহত করার প্রয়োজন হলে ব্যতিক্রমের সুযোগও রয়েছে।
আরেকটি ফেডারেল আইন সামরিক সদস্যদের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ নিষিদ্ধ করে এবং আরও কয়েকটি আইন ভোটারদের ভয় দেখানোর চেষ্টা নিষিদ্ধ করে। এ বছরই এই বিধানগুলো পরীক্ষার মুখে পড়েছে: মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রাইমারি চলাকালে টেক্সাসের সান আন্তোনিও ও ক্যালিফোর্নিয়ার ভেনতুরা কাউন্টিতে অন্তত দুটি ঘটনায় আইসিই এজেন্টরা ভোটকেন্দ্রের কাছে নিয়মিত অভিযান চালিয়েছেন বলে জানা গেছে। দুই ক্ষেত্রেই স্থানীয় পুলিশের অনুরোধে এজেন্টরা সেখান থেকে চলে যান।
ভোটকেন্দ্রের কাছে আইন প্রয়োগের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, অধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাচন-সংক্রান্ত কাজে আইসিই এজেন্টদের ব্যবহার করেছে। আইসিইর অধীন অফিসগুলোর একটি হলো হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশনস (এইচএসআই)। এই বছরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগের মাসগুলোতে এইচএসআইকে অ-নাগরিকদের ভোটদান—যা অবৈধ, কারণ ফেডারেল নির্বাচনে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাই ভোট দিতে পারেন—তদন্তে অগ্রাধিকার দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
আগস্ট থেকে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ অন্তত নয়টি অঙ্গরাজ্যে ভোটার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন খতিয়ে দেখতে এইচএসআই এজেন্টদের ‘মাঠ তদন্তে’ পাঠিয়েছে। কেউ কেউ নাকি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাসিন্দাদের জিজ্ঞেস করেছেন, তারা নাগরিক কি না এবং তারা ভোট দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন কি না। এই সপ্তাহে একজন ফেডারেল বিচারক হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগকে সেই তদন্তগুলো স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন; তিনি উল্লেখ করেছেন, একজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ভুল করে এর আওতায় পড়ে ভয়ভীতির শিকার হতে পারেন এবং অভিযুক্ত অ-নাগরিকদের শনাক্ত করার পদ্ধতিতে ভুলের সম্ভাবনাও বেশি।
ট্রাম্প অ-নাগরিক ভোটদানকে ব্যাপক ভোট জালিয়াতির বিষয়ে তার মিথ্যা দাবির সমর্থন হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, এই আশঙ্কা ভিত্তিহীন—ট্রাম্প এটিকে ব্যাপক সমস্যা হিসেবে দেখালেও বাস্তবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া অ-নাগরিকের সংখ্যা অত্যন্ত কম। তবু ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা অবৈধ ভোট ঠেকাতে আইসিই এজেন্ট ব্যবহারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, যা ভোটের দিন পর্যন্ত গড়াতে পারে। মে মাসে সাংবাদিকরা ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য তিনি নভেম্বরে ভোটের জায়গাগুলোতে ন্যাশনাল গার্ড বা আইসিই পাঠাবেন কি না। সরাসরি উত্তর এড়িয়ে ট্রাম্প বলেন, সৎ নির্বাচন নিশ্চিত করতে যা প্রয়োজন তিনি তাই করবেন, সৎ নির্বাচন হতেই হবে। সেপ্টেম্বরে হোমল্যান্ড সিকিউরিটি সচিব মার্কওয়েন মুলিন বলেন, আইসিই ভোটকেন্দ্রে টহল দেবে না, তবে অন্য কারণে এজেন্টরা সেখানে থাকতে পারে—কোনো হুমকি থাকলে বা সক্রিয়ভাবে খুঁজছেন এমন কারও বিরুদ্ধে পরোয়ানা কার্যকর করতে হলে। অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ মার্চে এক রক্ষণশীল সম্মেলনে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ভোটকেন্দ্রে আইসিই পাঠানো নিয়ে আপত্তি কেন—অবৈধরা ভোট দিতে পারে না, এতে কোনো অর্থ নেই বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এই বক্তব্যগুলোই অধিকার গোষ্ঠীগুলোকে সতর্ক করে তুলেছে, যাদের আশঙ্কা ভোটের দিন আইসিইর উপস্থিতি ভোটার উপস্থিতি কমিয়ে দিতে পারে। মঙ্গলবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আইসিই এজেন্টদের ভোটকেন্দ্র বা অন্যান্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের জায়গার কাছে মোতায়েন না করার নির্দেশ দিতে। সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক ফিলিপ বোলোপিয়ন বলেন, আইসিই কর্মকর্তাদের নির্যাতনে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাই ইতিমধ্যে থামানো, মারধর, আটক, বিতাড়ন এমনকি হত্যার শিকার হয়েছেন; ভোটারদের ভোট দিতে গিয়ে আইসিইর জালে পড়ার ভয় পাওয়া উচিত নয়। ১৬ অক্টোবর অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও একই ধরনের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, যোগ্য ভোটারদের বৈষম্যমূলক ও নির্বিচার বাধা, সশস্ত্র বাহিনীর ভয়ভীতি বা ক্ষতির ভয় ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অর্থপূর্ণ সুযোগ থাকতে হবে। ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, এই বিতর্কই এখন নির্বাচনের আগে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।






