সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভেঙে থমকে গেছে এইচএসসি পরীক্ষার্থী মিজানুরের পড়ালেখা, সহায়তার আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তিনি
একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে কলেজছাত্র মো. মিজানুর রহমানের জীবন। যে বয়সে বই-খাতা হাতে নিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি তিনি। এখন চিকিৎসা, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা আর পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার অনিশ্চয়তা প্রতিনিয়ত তাড়া করছে মিজানুরকে।
মিজানুর টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের লোকেরপাড়া ইউনিয়নের আথাইল শিমুল গ্রামের মো. দুলাল সরকারের ছেলে। তিনি ভূঞাপুর মনিরুজ্জামান বিএম কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। একটি দুর্ঘটনা তাঁর পরীক্ষা, পড়ালেখা ও পরিবারের স্বপ্ন — সবকিছুকেই অনিশ্চয়তার মুখে ফেলে দিয়েছে।
দুর্ঘটনার কারণে গত এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি মিজানুর। তাঁর বাবা কৃষিকাজ করে ছয় সদস্যের সংসার চালান। সীমিত আয়ের এই পরিবারের পক্ষে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার খরচ জোগানো দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
মিজানুর জানান, পরিবারে বাবা-মাকে সহযোগিতা করতে পড়ালেখার পাশাপাশি পিকআপ ভ্যানের চালকের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। গত ৩ জুলাই সকালে ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায় পিকআপ ভ্যানের চালক ঘুমন্ত অবস্থায় বাসের পেছনে ধাক্কা দেন। এতে তাঁর বাম পা ভেঙে যায়।
দুর্ঘটনার পর এলাকাবাসী তাঁকে উদ্ধার করে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তিনি টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে ধারদেনা করে বেসরকারি এক হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর পায়ে রড দেওয়া হয়। এখনো তিনি পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি।
মিজানুর বলেন, ‘আমার পরিবার অর্থনৈতিকভাবে খুব দুর্বল। একটু সহযোগিতার জন্য জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। কোথাও থেকে আর্থিক কোনো সহযোগিতা পাইনি। আমি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে সরকারি, বেসরকারি সহযোগিতা কামনা করছি। আমি সুস্থ হয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। তাঁদের সার্বিক সহযোগিতা করতে চাই।’
মিজানুর রহমানের বাবা মো. দুলাল সরকার বলেন, ‘আমি খুব কষ্টে সংসার চালাই। জমানো টাকা ও ঋণ করে আমার ছেলের চিকিৎসা করিয়েছি। সব মিলিয়ে আমার পরিবারের সব সদস্যের চলতে খুব কষ্ট হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি অর্থনৈতিক সহযোগিতা পেলে আমাদের অনেক উপকার হতো।’
টাঙ্গাইল জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক আল আমিন বলেন, ‘মিজানুর রহমানের আগে হয়তো নানা স্বপ্ন ছিল, পড়ালেখা করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রত্যাশা ছিল। একটি দুর্ঘটনা যেন সবকিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। শারীরিক যন্ত্রণার পাশাপাশি এখন তাঁকে লড়তে হচ্ছে আর্থিক সংকট ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সঙ্গে।’
তিনি আরও বলেন, পরিবারের সামর্থ্য সীমিত হলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা জরুরি। তাঁর ভাষায়, ‘একদিকে শারীরিক সীমাবদ্ধতা, অন্যদিকে চিকিৎসার খরচ জোগাড়ের দুশ্চিন্তা — এমন পরিস্থিতিতে তাঁর মতো শিক্ষার্থীর পাশে দাঁড়ানো শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, ভবিষ্যৎ রক্ষারও একটি উদ্যোগ।’ সব পর্যায় থেকে তাঁকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এ বিষয়ে জানতে টাঙ্গাইল বিআরটিএ সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার শেখ মাহতাব উদ্দিন আহমেদের মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রচলিত সহায়তা প্রক্রিয়া নিয়ে কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য এই প্রতিবেদনে যুক্ত করা যায়নি।
মিজানুরের গল্পটি শুধু একজন শিক্ষার্থীর দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি পড়ালেখার পাশাপাশি পরিবারের জন্য কাজ করতে বাধ্য হওয়া অসংখ্য শিক্ষার্থীর ঝুঁকিপূর্ণ জীবনেরও প্রতিচ্ছবি। কাজ করতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এখন তাঁর পড়ালেখায় ফেরাটাই নির্ভর করছে চিকিৎসা ও সহায়তার ওপর।
এখন মিজানুর ও তাঁর পরিবারের একটাই প্রত্যাশা — সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে তিনি সুস্থ হয়ে আবার পড়ালেখায় ফিরতে পারবেন, এইচএসসি পরীক্ষায় বসতে পারবেন এবং বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের পথে এগিয়ে যেতে পারবেন। সেই সহায়তা কবে আসে, সেদিকেই তাকিয়ে আছে পরিবারটি।






