আলোচনার ইঙ্গিতের মধ্যেই হামলা জোরদার রাশিয়া-ইউক্রেনের, আবুধাবিতে বসতে পারে ত্রিপক্ষীয় বৈঠক
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের মধ্যেই দুই দেশ পরস্পরের ওপর হামলা জোরদার করেছে। বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া, আর মস্কোর দিকে শত শত ড্রোন পাঠানোর দাবি করেছে রুশ কর্তৃপক্ষ। হামলা-পাল্টা হামলার এই আবহেই আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা আবার শুরু হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দুই পক্ষের নেতারা।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাশিয়া তিন দফায় অন্তত ২১টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এর মধ্যে তিনটিতে ক্লাস্টার যুদ্ধাস্ত্র ছিল বলে দাবি করেন তিনি। এ ধরনের অস্ত্র বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে বেসামরিক মানুষের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে।
জেলেনস্কির ভাষ্য অনুযায়ী, ১২টি অঞ্চলে হামলায় দুজন নিহত এবং ৩৪ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচটি শিশু রয়েছে। তবে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা কয়েকটি এলাকায় আরও বেশি হতাহতের তথ্য জানিয়েছেন, ফলে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র পেতে আরও সময় লাগতে পারে।
অন্যদিকে রাশিয়ার দাবি, রাতভর মস্কোর দিকে ৬৩০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন পাঠানো হয়েছে। মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, ড্রোন হামলায় রাজধানীর কাছাকাছি দুজন আহত হয়েছেন। বেশির ভাগ ড্রোন দূরবর্তী এলাকাতেই ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
এর মধ্যেই রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আলোচনা আবার শুরু করতে রাশিয়া প্রস্তুত। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার রুশ টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
পুতিনের মতে, যুদ্ধের অবসানের পর রাশিয়া, ইউক্রেন ও ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত। ক্রেমলিন জানিয়েছে, প্রস্তাবিত ত্রিপক্ষীয় আলোচনা কারিগরি পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হবে এবং তা সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে আগামী ১০ নভেম্বর বা তার পরের কোনো সময়ে শুরু হতে পারে।
সেন্ট পিটার্সবার্গের একটি রাজকীয় প্রাসাদে পুতিন ও উইটকফের মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টা বৈঠক হয়। এটি ছিল তাদের নবম সরাসরি বৈঠক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
তবে বৈঠকের ফল নিয়ে দুই পক্ষের ভাষ্যে পার্থক্য রয়েছে। ক্রেমলিনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বৈঠকটি সংক্ষিপ্ত ছিল এবং এতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি; যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনার জন্য পুতিনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ক্রেমলিনের সহযোগী ইউরি উশাকভ বলেন, এসব বিষয়ে রাশিয়া পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয়।
বৈঠকের আগে নরওয়ের রাজধানী ওসলোতে জেলেনস্কি, ফিনল্যান্ড ও নরওয়ের নেতাদের পাশাপাশি ইউরোপীয় ও ন্যাটো প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন উইটকফ। ওই আলোচনায় ইউক্রেন নতুন কিছু ধারণা ও প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানিয়েছেন একজন মার্কিন কর্মকর্তা।
জেলেনস্কিও আশা প্রকাশ করেছেন, ফেব্রুয়ারির পর প্রথমবারের মতো দুই দেশের আলোচনা নভেম্বরের শুরুতে হতে পারে। তিনি পুতিন ও ট্রাম্পের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে যুদ্ধ অবসানের মূল বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার আশা করছেন। তবে ক্রেমলিনের মতে, দুই নেতার বৈঠকের আগে সহযোগীদের মাধ্যমে সতর্ক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
আলোচনার শর্ত নিয়ে ব্যবধান এখনো বড়। রাশিয়ার শর্ত অনুযায়ী ইউক্রেনকে আরও ভূখণ্ড ছেড়ে দিতে হবে, সামরিক বাহিনীর আকার সীমিত করতে হবে এবং সামরিক জোটে যোগ দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। পুতিনের মূল দাবির মধ্যে রয়েছে পূর্ব ইউক্রেনের দোনেৎস্ক অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ, ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের সম্ভাবনা নাকচ করা এবং সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিবর্তে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তি। কিয়েভ এসব শর্তকে আত্মসমর্পণের দাবি হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এদিকে ইউক্রেনে স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ইলন মাস্কের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি তিনি; বলেছেন, মূল কথা হলো সেবাটি আবার চালু হয়েছে। তবে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, স্টারলিংকের গতি এখনো আগের অবস্থায় ফেরেনি এবং সেবাটির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধের বেশির ভাগই বহাল রয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে যোগাযোগ ও ড্রোন পরিচালনায় স্টারলিংক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় এই সীমাবদ্ধতা ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কেও সম্প্রতি টানাপোড়েন বেড়েছে। রাশিয়ার তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার সমালোচনা করেছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে কিয়েভের অভিযোগ, রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কসংক্রান্ত তথ্য এবং ইউরোপের কেনা কিছু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে সমস্যা তৈরি হয়েছে। তবে ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে নীতি পরিবর্তনের অভিযোগ অস্বীকার করেছে ওয়াশিংটন।
মাঠের লড়াইও থামেনি। ইউক্রেনের ওদেসা অঞ্চলের বন্দর অবকাঠামো ও সামরিক কাজে ব্যবহৃত জাহাজে বড় ধরনের হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে রাশিয়া, আর ইউক্রেনের বিভিন্ন অঞ্চলে রুশ হামলায় হতাহতের পাশাপাশি অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। গত বুধবারের বৈঠকে পুতিন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ নিরসনে সহায়তার প্রস্তাবও দেন, তেহরানের সঙ্গে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে।
সব মিলিয়ে যুদ্ধের ময়দানে সংঘাত অব্যাহত থাকলেও কূটনৈতিক আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে ভূখণ্ড, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ও সামরিক জোট নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থানের বড় ব্যবধানের কারণে নতুন আলোচনায় কতটা অগ্রগতি হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।





