ইউরোপের পোশাক বাজারে পিছিয়ে বাংলাদেশ: আট মাসে রফতানি আয় কমল ১৫৭ কোটি ইউরো, এগিয়ে গেল চীন-ভিয়েতনাম
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি কমার ধারা থামছে না। বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) সংকলিত ইউরোস্ট্যাটের জানুয়ারি-আগস্ট ২০২৬ সময়ের তথ্য অনুযায়ী, এই আট মাসে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৯৩ কোটি ইউরো—আগের বছরের একই সময়ের ১ হাজার ৩৫০ কোটি ইউরোর তুলনায় ১১ দশমিক ৬৭ শতাংশ কম। অর্থাৎ মাত্র আট মাসে বাংলাদেশের রফতানি আয় কমেছে ১৫৭ কোটি ইউরো।
বিপরীতে একই বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে চীন; রফতানি বাড়িয়েছে ভিয়েতনামও। ইউরোপের মোট পোশাক আমদানিতে চীনের অংশ ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে, আর বাংলাদেশের অংশ ২১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে নেমে এসেছে ১৯ দশমিক ৮ শতাংশে। অর্থাৎ বাজার ছোট হওয়ার ধাক্কা সবাই খেলেও বাংলাদেশ খেয়েছে তুলনামূলক বড় ধাক্কা।
সার্বিক ছবিটিও স্বস্তির নয়। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইইউর দেশগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মোট ৬ হাজার ২৯ কোটি ইউরোর পোশাক আমদানি করেছে—আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশ কম। আমদানির পরিমাণ কমেছে ২ দশমিক ৫৭ শতাংশ, আর প্রতি কেজি পোশাকের গড় দামও কমেছে ১ দশমিক ২৯ শতাংশ।
বিএভির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরুতে ইউরোপের পোশাক আমদানিতে বড় ধস নামে। জানুয়ারি-এপ্রিল সময়ে আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমে যায়; শুধু জানুয়ারিতেই কমেছিল ১৫ দশমিক ৪৮ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ও ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ায় খুচরা বিক্রেতারা নতুন ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিয়েছিলেন।
তবে মে থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। বসন্তে ইউরোপের খুচরা বিক্রি তুলনামূলক ভালো থাকায় পরবর্তী সময়ে নতুন ক্রয়াদেশ কিছুটা বাড়ে; শরৎ ও শীত মৌসুমের পোশাকের চাহিদা মেটাতে জুন-আগস্টে আমদানি বাড়ে এবং বছরের শুরুতে পিছিয়ে যাওয়া কিছু চালানও পরে পৌঁছায়। ফলে মে-আগস্ট সময়ে ইইউর পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে, আর আট মাস শেষে আমদানি কমার হার নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৮৩ শতাংশে। অর্থাৎ বাজার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে—কিন্তু বাংলাদেশ সেই ঘুরে দাঁড়ানোর সুফল এখনো পাচ্ছে না।
এর কারণ লুকিয়ে আছে পরিমাণ আর দাম—দুই দিকেরই পতনে। জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে ইইউতে বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা পোশাকের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৬ কোটি ৬৭ লাখ ৬০ হাজার কেজি, আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। আর প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম কমেছে ৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ; আট মাসে এই দাম দাঁড়িয়েছে ১৩ দশমিক ৭৬ ইউরো। বিএভির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রফতানি আয় পতনের বড় অংশের পেছনেই রয়েছে পোশাকের দাম কমে যাওয়া—পরিমাণ কমার চেয়ে আয়ের ওপর দামের পতনের প্রভাব বেশি পড়েছে।
বছরের প্রথম দুই মাসে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমেছিল ১৯ শতাংশ। পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও আট মাস শেষে রফতানির মূল্য এখনও আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম—এই পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে, পুনরুদ্ধারের গতি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কতটা ধীর।
প্রতিযোগীদের চিত্র ঠিক উল্টো। ইউরোপের বাজারে প্রধান সরবরাহকারীদের মধ্যে চীনই সবচেয়ে ভালো অবস্থানে: জানুয়ারি-আগস্ট সময়ে দেশটি ইইউতে ১ হাজার ৯৭১ কোটি ইউরোর পোশাক রফতানি করেছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ৩৮ শতাংশ বেশি। চীন একমাত্র প্রধান সরবরাহকারী, যার রফতানির মূল্য ও পরিমাণ—দুটিই বেড়েছে।
ভিয়েতনামের রফতানিও বেড়েছে: দেশটি ইইউতে ৩০০ কোটি ইউরোর পোশাক রফতানি করেছে, আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ বেশি; দেশটির পোশাকের গড় দাম বেড়েছে ১০ দশমিক ১১ শতাংশ—অর্থাৎ ভিয়েতনাম শুধু বেশি বিক্রিই করছে না, বেশি দামেও বিক্রি করছে। অন্যদিকে পাকিস্তানের পোশাক রফতানির পরিমাণ ৩ দশমিক ৮২ শতাংশ বাড়লেও গড় দাম কমেছে ১২ দশমিক ৯৬ শতাংশ; দেশটির প্রতি কেজি পোশাকের গড় দাম ১০ দশমিক ৮৮ ইউরো, প্রধান সরবরাহকারীদের মধ্যে সর্বনিম্ন। এ ছাড়া তুরস্ক, ভারত, শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার ইইউতে পোশাক রফতানি কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ করে।
সামনের দিনের হিসাবে আশা-আশঙ্কা দুটোই আছে। ইউরোপীয় কমিশনের ২০২৬ সালের বসন্তকালীন অর্থনৈতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর ইইউর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ১ দশমিক ১ শতাংশ, যা ২০২৭ সালে বেড়ে ১ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে; একই সময়ে মূল্যস্ফীতি কমে ২ দশমিক ৪ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। তবে এই পূর্বাভাসের বড় শর্ত জ্বালানির দাম স্থিতিশীল থাকা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি, জাহাজ পরিবহন ও বিমা ব্যয় আরও বাড়তে পারে; কমিশনের হিসাবে, এই সংঘাত চলতি বছর ইইউর প্রবৃদ্ধি ০ দশমিক ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমিয়ে দিতে পারে।
বাজারের নাজুক অবস্থার আরেকটি নমুনা মিলেছে ১৭ অক্টোবর: ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভের সময় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে বিএভির প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে; ওই দিন পোশাকের দোকানগুলোর গড় বিক্রি কমে যায় ১৪ শতাংশ। বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। বছরের শেষ ভাগে বড়দিনকেন্দ্রিক বিক্রি দুর্বল হলে ২০২৭ সালের শুরুর দিকে ইউরোপের ক্রেতারা নতুন পোশাকের ক্রয়াদেশ কমিয়ে দিতে পারেন—তাতে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা থাকছেই।
এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে নীতি-পরিবর্তনের চাপ। আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ইইউর নতুন জিএসপি (অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা) বিধিমালা এবং ভারত-ইইউ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে; এসব পরিবর্তনে ইউরোপের বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়তে পারে।
এ পরিস্থিতিতে করণীয় নিয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক ও বিএভির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেল। তিনি বলেন, ইউরোপের পোশাক বাজারে চাহিদা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা গেলেও বাংলাদেশের রফতানি এখনও চাপের মধ্যে রয়েছে; বিশেষ করে পোশাকের গড় বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়ায় রফতানি আয় বেশি কমেছে। তাঁর মতে, শুধু রফতানির পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নজর দিলে হবে না—পণ্যের মূল্য সংযোজন বাড়ানো এবং তুলনামূলক বেশি দামের পোশাক উৎপাদনেও গুরুত্ব দিতে হবে।
মহিউদ্দিন রুবেল আরও বলেন, ইউরোপের বাজারে চীনের রফতানি বাড়ছে, ভিয়েতনামও ভালো করছে—ফলে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় ও ইউরোপের ক্রেতাদের অনিশ্চয়তা আগামী দিনের রফতানিকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই ক্রেতাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক জোরদার, পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। ২০২৭ সালে ইউরোপের বাণিজ্যনীতিতে সম্ভাব্য পরিবর্তন ও ভারতের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নতুন প্রতিযোগিতা তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করে তিনি বাজারের পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে পণ্যের মান, উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দেন; বাংলাদেশের প্রধান শক্তি—উৎপাদন দক্ষতা ও সরবরাহ সক্ষমতা—কাজে লাগিয়েই ইউরোপের বাজারে অবস্থান ধরে রাখতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
সব মিলিয়ে বার্তাটি পরিষ্কার: ইউরোপের পোশাক আমদানির বাজারে পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেলেও বাংলাদেশ এখনও চাপের মধ্যে। চীনের বাজার-দখল বাড়ানো, ভিয়েতনামের এগিয়ে যাওয়া আর পোশাকের গড় দাম কমে যাওয়ার প্রবণতা—তিন মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ। বড়দিনের বিক্রি আর নতুন বছরের ক্রয়াদেশের দিকেই এখন তাকিয়ে থাকতে হবে রফতানিকারকদের; সেই দুই সূচকই বলে দেবে, এই ধাক্কা সাময়িক নাকি দীর্ঘমেয়াদি।






