অভিষেকের ১১০০ বছর পরও বিস্মৃত ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা অ্যাথেলস্ট্যান
জীবদ্দশায় তিনি ছিলেন ইউরোপজুড়ে সুপরিচিত, অথচ আজ ইতিহাসের বইয়ে তাঁর নাম প্রায় খুঁজেই পাওয়া যায় না। ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা অ্যাথেলস্ট্যানের অভিষেকের ১১০০ বছর পূর্ণ হয়েছে, আর সেই উপলক্ষেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে প্রশ্নটি — কীভাবে একটি দেশ তার প্রথম রাজাকেই ভুলে গেল?
অ্যাথেলস্ট্যান ছিলেন বিখ্যাত রাজা আলফ্রেড দ্য গ্রেটের নাতি। নবম শতকে ভাইকিংদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আর ডেনিশদের বিপক্ষে বড় বিজয়ের জন্য আলফ্রেড খ্যাতি পেয়েছিলেন। তিনি ওয়েসেক্স থেকে উত্তর দিকে প্রভাব বিস্তার করেন এবং পূর্বের মার্সিয়া রাজ্যের কিছু অংশেও নিজের অবস্থান শক্ত করেন।
আলফ্রেডের ছেলে এডওয়ার্ড, যিনি অ্যাথেলস্ট্যানের বাবা, ডেনিশদের কাছ থেকে ইস্ট অ্যাংলিয়া পুনর্দখল করেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সারা ফুটের ভাষ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর সময় এডওয়ার্ডের রাজ্য হাম্বার নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এবং তিনি ‘অ্যাংলো-স্যাক্সনদের রাজা’ উপাধি ধারণ করতেন। এডওয়ার্ডের কাজই ছেলের জন্য শক্ত পথ তৈরি করে দেয়।
৮৯৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে জন্ম নেওয়া অ্যাথেলস্ট্যান ৯২৪ সালে বাবার মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন। কিছু প্রমাণ বলছে, শুরুতে তাঁর সৎভাই এলফওয়ার্ড ওয়েসেক্সের রাজা হয়েছিলেন আর অ্যাথেলস্ট্যান ছিলেন মার্সিয়ার রাজা। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অ্যাথেলস্ট্যানের জীবনীকার ডেভিড উডম্যান বলেন, এলফওয়ার্ড অজানা পরিস্থিতিতে এক মাসের মধ্যেই মারা যান এবং অ্যাথেলস্ট্যান হন অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজ্যের একক শাসক। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে অভিষিক্ত হন ৯২৫ সালের সেপ্টেম্বরে।
এরপরের ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত বদলে যায়। ৯২৬ সালে অ্যাথেলস্ট্যান তাঁর বোনের বিয়ে দেন উত্তরের নর্থামব্রিয়ার ভাইকিং রাজার সঙ্গে। এক বছর পর সেই রাজা মারা গেলে তিনি নর্থামব্রিয়া দখল করেন। লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের অধ্যাপক ক্লেয়ার ডাউনহ্যাম বলেন, ইংল্যান্ড রাজ্য গঠনের ক্ষেত্রে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
ওয়েসেক্স, মার্সিয়া আর নর্থামব্রিয়া — এই পৃথক রাজ্যগুলোকে একত্র করে অ্যাথেলস্ট্যান হন সমগ্র ইংল্যান্ডের প্রথম রাজা। সারা ফুট বলেন, তিনি জানতেন তিনি কী করছেন; তিনি এক নতুন ধরনের রাজ্য গড়ছিলেন এবং ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে এমন ঐক্য প্রতিষ্ঠা করছিলেন, যা রোমান যুগের পর আর দেখা যায়নি। তিনিই ছিলেন প্রথম ইংরেজ রাজা, যিনি মুকুট পরেছিলেন — সেই ঐতিহ্য আজও যুক্তরাজ্যে চলছে।
এই ঐক্যকে টিকিয়ে রাখতেও লড়তে হয়েছে তাঁকে। ৯৩৭ সালের ব্রুনানবুর্হ যুদ্ধে তিনি ভাইকিং, স্কট এবং স্ট্র্যাথক্লাইডের ওয়েলশদের জোটকে পরাজিত করেন, যারা ইংল্যান্ডের ওপর তাঁর কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। যুদ্ধের নির্দিষ্ট স্থান জানা যায়নি, তবে তা সম্ভবত ছিল ইংল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে।
কেবল যুদ্ধজয়ী শাসক ছিলেন না অ্যাথেলস্ট্যান। উডম্যানের মতে, তিনি ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ রাখতেন, কয়েকজন সৎবোনের বিয়ে দেন ইউরোপের শাসক পরিবারগুলোর সঙ্গে এবং ইউরোপীয় পণ্ডিতদের ইংল্যান্ডে আসতে উৎসাহিত করেন। তাঁর রাজকীয় সমাবেশে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন রাজ্য, সমগ্র ব্রিটেন ও ইউরোপ থেকে মানুষ আসত; সেখানে প্রাচীন ওয়েলশ, প্রাচীন নর্স, পুরোনো ইংরেজি আর লাতিন — নানা ভাষায় কথা হতো।
ইতিহাসবিদদের মতে, এই বৈচিত্র্যই আজকের আলোচনার কেন্দ্রে। উডম্যান বলেন, অ্যাথেলস্ট্যানের কাহিনি সেই শতাব্দী পুরোনো ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানায় যে ইংল্যান্ড শুরু থেকেই সাংস্কৃতিকভাবে একরকম ছিল। ডাউনহ্যামও বলেন, আজ যাকে ইংল্যান্ড বলা হয়, সেখানে সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ছিল অনেক; ৫০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে শুরু হওয়া কোনো একক ইংরেজ ঐক্য বলে কিছু ছিল না।
তবু ৯৩৯ সালে তাঁর মৃত্যুর পর তিনি যে রাজ্য গড়েছিলেন, তা দ্রুত ভেঙে পড়ে; নর্থামব্রিয়া আবার পৃথক রাজ্য হয়ে ওঠে। উডম্যান বলেন, এটি দেখায় তাঁর নির্মাণ কতটা ভঙ্গুর ছিল, আবার একই সঙ্গে তাঁর অর্জন কতটা যুগের চেয়ে এগিয়ে এবং এক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল। অবশ্য বৃহত্তর রাজ্যের ধারণাটি টিকে যায় — সারা ফুটের ভাষ্য অনুযায়ী, ৯৫৪ সাল থেকে আবার ঐক্যবদ্ধ রাজ্য দেখা যায়, যা এরপর আর স্থায়ীভাবে বিভক্ত হয়নি।
তাহলে তিনি বিস্মৃত হলেন কেন? ইতিহাসবিদদের একটি বড় ব্যাখ্যা হলো — আলফ্রেডের জীবদ্দশায় ওয়েলশ সন্ন্যাসী অ্যাসার তাঁর জীবনী লিখেছিলেন, ফলে দাদার জীবন্ত চিত্র পাওয়া যায়। অ্যাথেলস্ট্যানের ক্ষেত্রে সমসাময়িক কোনো জীবনীকার ছিলেন না। তাঁর মৃত্যুর পর দশম শতকে একটি জীবনী লেখা হলেও মূল লেখাটি টিকে নেই; হাতে আছে কেবল সনদ, আদেশ আর চুক্তির মতো নথি, যা ব্যক্তিজীবনের আকর্ষণীয় বর্ণনা দেয় না। পরে এলিজাবেথীয় যুগে ইংল্যান্ডের উৎস খুঁজতে গিয়েও তাঁকে উপেক্ষা করা হয়, ভিক্টোরীয় যুগেও তিনি থেকে যান প্রান্তিক উল্লেখমাত্র।
উডম্যানের মতে, অভিষেকের ১১০০ বছর পূর্তিতে তাঁর শাসনকাল নতুন করে পর্যালোচনা করলে যারা ‘ইংরেজ হওয়ার’ অর্থ বুঝতে চান, তারা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেতে পারেন। বিস্মৃত এই প্রথম রাজাকে এবার আরও ভালোভাবে স্মরণ করার সময় এসেছে বলেই মনে করেন তিনি।





