সুদানে সোনার খোঁজে প্রাণ গেল ১৬ বছরের আলতায়েবের: বিমান হামলায় নিহত অন্তত ৭২ খনি শ্রমিক
সুদানের লোহিত সাগর অঞ্চলের জাবাল আল-আইগদাতের কাছে একটি সোনার খনির এলাকায় ১০ অক্টোবর বিমান হামলায় অন্তত ৭২ জন খনি শ্রমিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের একজন ১৬ বছর বয়সী আলতায়েব আলহাদি। হামলাটি মিসরের সামরিক বাহিনীর বলে অভিযোগ উঠেছে।
আলতায়েবের বয়স যখন মাত্র ছয় বছর, তখন দক্ষিণ-মধ্য সুদানের হোয়াইট নাইল রাজ্যে নিজ গ্রামে একটি কূপ ধসে তার বাবা মারা যান। দুই মাস পর মারা যান তার মা-ও। পাঁচ ভাইবোন এতিম হয়ে পড়ে, আর সবার বড় হিসেবে সংসার চালানোর দায়িত্ব এসে পড়ে আলতায়েবের কাঁধে।
১৪ বছর বয়সে আলতায়েব গাল্লি গ্রামের বাড়ি থেকে শত শত কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে উত্তরে যায়, যেখানে পাহাড়জুড়ে সোনার খনি। উদ্দেশ্য ছিল ভাইবোনদের খাওয়ানো আর তাদের স্কুলে রাখা। তার চাচা আলহাদি হামিদ বলেছেন, পরিবার তাকে বিপদের কথা বলে সতর্ক করেছিল; এলাকায় যাওয়া আত্মীয়রা রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য সেবামূলক কাজ পেলেও ভূগর্ভে খননের কাজে যাননি।
শুরুতে আলতায়েব পরিবহনসহ নানা কাজ করেছে। পরে খনি শ্রমিকদের লাভের গল্প শুনে সে আশপাশের পাহাড়ে সোনা খোঁজা শুরু করে। খনির জায়গায় পৌঁছানোর কয়েক মাসের মাথায় ঘটে এই হামলা।
আলতায়েব প্রায় ১৫ জন তরুণ ও শিশুর সঙ্গে কাজ করত। সাধারণ যন্ত্রপাতি দিয়ে পাথর থেকে সোনা বের করা হতো, দিনরাত কাজ চলত, আর সংগৃহীত উপকরণ প্রক্রিয়াজাতের জন্য কাছের মিলে নিয়ে যাওয়া হতো।
এক সহকর্মী খনি শ্রমিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, হামলার দিন তাদের আলাদা হওয়ার আধা ঘণ্টাও পার হয়নি। হঠাৎ বোমাবর্ষণের বিকট শব্দ শুনে সবাই ছুটতে শুরু করে, কয়েক মিনিটের মধ্যে একের পর এক হামলা হয়। আলতায়েবকে পাওয়া যায় হাত ও পা উড়ে যাওয়া এবং পেটে গুরুতর ক্ষত নিয়ে; পাহাড়ের কাছে নিরাপদ জায়গায় নেওয়া হলেও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সে মারা যায়।
আয়ের হিসাবটা ছিল অনিশ্চিত। ওই শ্রমিকের ভাষ্য অনুযায়ী, এক গ্রাম বা তার কম সোনা পেতে দুই থেকে তিন সপ্তাহ খুঁড়তে হতো; তা বিক্রি করে প্রায় ১০০ ডলার পাওয়া যেত, যা ভাগ করে নেওয়া হতো। ভালো দিনে দলটি ১০০ ডলারের বেশি আয় করতে পারত।
মৃত্যুর ১০ দিন আগে আলতায়েব ভাইবোনদের বলেছিল, সে শিগগিরই বাড়ি ফিরবে—তার বোন রোগাইয়া আলহাদি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে এ কথা জানিয়েছেন। চাচা জানান, হামলার দিন সকালে খনির কাছের একটি রেস্তোরাঁয় বন্ধুদের সঙ্গে চা খেয়ে সে শেষবারের মতো খনির দিকে রওনা হয়; মিনিট কয়েক পরেই হামলা হয়।
মিসরের কর্তৃপক্ষ সুদানি খনি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এনেছে এবং কাউকে কাউকে সোনা পাচার, মাদক ও মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত বলে দাবি করেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সুদানের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
২০২৩ সালে সুদানের সামরিক বাহিনী ও আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দেশটির অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে। আয়ের অন্য কোনো উৎস না থাকায় হাজারো মানুষ উত্তরের কারিগরি সোনার খনিতে কাজ খুঁজতে বাধ্য হয়েছেন।
এই খনিগুলোতে বিপদ শুধু বিমান হামলা নয়—খনির গর্ত ধস, অস্থিতিশীল মাটি আর চিকিৎসা সেবার অভাবও শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। রিভার নাইল রাজ্যে ১০ বছর খনিতে কাজ করা মোহামেদ আওয়াদালকারিম বলেছেন, শ্রমিকরা প্রায়ই বস্তার কাপড় ও প্লাস্টিকের শিট দিয়ে বানানো অস্থায়ী কুঁড়েঘরে থাকেন, খাবার বলতে মূলত ডাল আর সরঘমের জাউ।
চ্যাথাম হাউস গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সুদানের ঘোষিত সোনা উৎপাদনের ৫৩.৭১ টন—প্রায় ৮৩ শতাংশ—এসেছে কারিগরি ও ক্ষুদ্র পরিসরের খনি থেকে, যদিও এই হিসাব শুধু সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকার। সারা দেশের ১৮টি রাজ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষ এই কারিগরি খননকাজে জড়িত, যা থেকে বছরে প্রায় ১০০ কোটি ডলার আয় হয়।
এর আগেও গত ১৬ জুন মিসর সীমান্তের কাছে খনির এলাকায় হামলায় কয়েকজন নিহত ও আহত হওয়ার খবর পাওয়া গিয়েছিল। সুদানের সামরিক নেতা আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান অক্টোবরের হামলা তদন্তে প্রসিকিউটর, বিচার বিভাগীয় প্রতিনিধি ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোকে নিয়ে একটি তথ্যানুসন্ধান কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানা গেছে; তবে জুনের একই ধরনের ঘটনার তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
আলতায়েবের ভাইবোনেরা এখন চাচা-ফুফুসহ বর্ধিত পরিবারের কাছে থাকে। গাল্লি গ্রামে তার স্মৃতি ধরে রাখতে স্থানীয়রা নানা উদ্যোগ নিচ্ছেন বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।

