ট্রাম্পের গরুর মাংসে শুল্ক স্থগিতে ক্ষুব্ধ মার্কিন খামারিরা, বাড়ছে ব্রাজিল থেকে আমদানি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আগস্টের শেষ দিকে নির্দিষ্ট গরুর মাংসের ওপর শুল্কে ৯০ দিনের স্থগিতাদেশ ঘোষণা করেন। এতে বিশেষ করে ব্রাজিল থেকে গরুর মাংস আমদানি সস্তা হয়েছে। সিদ্ধান্তটি ভোক্তাদের জন্য দাম কমানোর উপায় হিসেবে তুলে ধরা হলেও অনেক মার্কিন খামারির কাছে তা হতাশাজনক হিসেবে এসেছে, কারণ তাঁরা তখনই তাঁদের গবাদিপশু বাজারে তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
খামারিদের ওপর এর প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক। গবাদিপশুর নিলামে দাম হঠাৎ কমে যায়, ফলে খামারিদের মুনাফা সাময়িকভাবে কমে যায়। খামারিদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনাইটেড স্টেটস ক্যাটলমেনস অ্যাসোসিয়েশন, ন্যাশনাল ক্যাটলমেনস বিফ অ্যাসোসিয়েশন এবং ফার্ম ব্যুরো এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। মুদি দোকানে দামের ওপর এর চূড়ান্ত প্রভাব কী হবে, তা এখনো বলা যাচ্ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গ্রামীণ এলাকার রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্যরাও এই সিদ্ধান্ত থেকে নিজেদের দূরে রেখেছেন। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে খামারিরা কীভাবে ভোট দেবেন, কিংবা সেই ভোট প্রতিযোগিতার ফল নির্ধারণ করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কানসাসের প্রিটি প্রেইরির খামারি চ্যাড বাসিঞ্জার সন্দেহ প্রকাশ করেছেন যে আমদানির তেমন বড় প্রভাব পড়বে। তাঁর ভাষ্য, কেউ কেউ বলছেন তাঁরা অন্য দলকে ভোট দেবেন কিংবা ভোটই দেবেন না এবং এই প্রশাসন তাঁদের হতাশ করেছে, ফলে কিছু মানুষ মধ্যবর্তী নির্বাচনে অন্য দিকে ঝুঁকবেন, তবে সামগ্রিকভাবে তা খুব বেশি হবে না বলেই তিনি মনে করেন।
বাসিঞ্জার আরও বলেন, খামারিরা প্রশাসনের অন্য পদক্ষেপগুলোও বিবেচনায় নেবেন, যেমন ১৯ অক্টোবর কানসাসে ঘোষিত ৮০০ কোটি ডলারের কৃষি সহায়তা। তাঁর নিজের হাউস জেলা কানসাসে মধ্যবর্তী নির্বাচনে নিরাপদে রিপাবলিকান থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে কানসাসে অপ্রত্যাশিতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট নির্বাচন রয়েছে এবং মন্টানা, আইওয়া, টেক্সাস ও কলোরাডোর সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ জেলাগুলো গবাদিপশু অধ্যুষিত এলাকায় অবস্থিত।
তবে খামারিরা একাই নির্বাচন নির্ধারণ করবেন, এমন সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রের গবাদিপশুর পাল এখন ১৯৫১ সালের পর সবচেয়ে ছোট আকারের কাছাকাছি এবং গবাদিপশুর সংখ্যার সঙ্গে খামারিদের সংখ্যাও কমেছে। শুল্ক, জ্বালানির দাম ও খরার কারণে চলমান অনিশ্চয়তা খামারি জনসংখ্যা আরও কমিয়ে দিতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
টেক্সাস এঅ্যান্ডএম বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতিবিদ ডেভিড অ্যান্ডারসন, যিনি খামারিদের পরামর্শ দেন, বলেন, এ বছরের উচ্চ দাম খামারিদের ভবিষ্যতে বিনিয়োগ ও পাল সম্প্রসারণের আস্থা জোগানোর কথা ছিল। আমদানি সস্তা করা তাঁদের বিপরীত দিকে ঠেলে দিতে সাহায্য করে থাকতে পারে। তাঁর ভাষ্য, এটি দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর বাজার সংকেতের বিপরীতে কাজ করে এবং এতে অনেক মানুষ বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন।
ট্রাম্পের শুল্ক এর আগেও গবাদিপশু সরবরাহে প্রভাব ফেলেছে। গত বছর তিনি গরুর মাংসের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার ব্রাজিলের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন, ফলে ব্রাজিলের চর্বিহীন গরুর মাংস আমদানির খরচ বাড়ে; এই মাংস প্রায়ই মার্কিন চর্বিযুক্ত গরুর মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে হ্যামবার্গার প্যাটি তৈরি করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে তিনি আর্জেন্টিনা থেকে আরও শুল্কমুক্ত গরুর মাংস আমদানির অনুমতি দেন এবং আগস্টে ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ের ক্ষেত্রেও একই সিদ্ধান্ত নেন। দুটি শুল্ক পরিবর্তনেই গবাদিপশুর ফিউচার বাজারে দ্রুত দামের ওঠানামা দেখা যায়।
এ বছর দাম নড়েছে সরবরাহ ও চাহিদার আরও মৌলিক কারণেও—মাংস প্রক্রিয়াজাতকারীদের কারখানা বন্ধ, গত মাসের শেষ দিকে কানসাসের প্যাকিং প্ল্যান্টে আইসিইর কার্যক্রমসংক্রান্ত শ্রমিক সংকট, যা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম, এবং নিউ ওয়ার্ল্ড স্ক্রুওয়ার্ম রোগের কারণে বন্ধ থাকার পর দক্ষিণ সীমান্ত আবার খোলা।
বড় চিত্রে, মার্কিন গবাদিপশুর পাল সংকোচনের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি দাম পরিবর্তনের চেয়ে খরা চক্রের সম্পর্ক বেশি, যা তাপমাত্রা বাড়ায় বাষ্পীভবন বাড়ার সঙ্গে আরও তীব্র হচ্ছে। তবু শুল্ক পরিবর্তন অনিশ্চয়তা বাড়ায়। অ্যান্ডারসন বলেন, গত ছয় সপ্তাহ ধরে এটি আলোচিত বিষয় হয়ে আছে এবং এটি আরও কিছুটা অনিশ্চয়তা, অস্থিরতা কিংবা উদ্বেগ বা চাপ বাড়িয়ে দেয়।
বাসিঞ্জার বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠিত খামারির জন্য শুল্ক ঘোষণাটি হতাশাজনক হলেও অস্তিত্বসংকট নয় এবং তাঁরা তাঁদের কৌশল বদলাবেন না। তাঁর মতে, পরবর্তী প্রজন্মের ক্ষেত্রে দামের অস্থিরতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ আজকের বেশিরভাগ খামারি অবসরের দিকে তাকিয়ে আছেন এবং তাঁদের উত্তরাধিকারীদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে তাঁরা খামার চালাবেন নাকি পারিবারিক জমি বিক্রি করে দেবেন।
এ বছর কম সরবরাহের কারণে আমদানি বাড়া সত্ত্বেও খামারিরা রেকর্ড উচ্চ দাম পেয়েছেন, তবে উচ্চ আয় মানেই বড় মুনাফা নয়; অনেক খামারি পরপর কয়েক বছর লোকসানে থাকেন এবং কয়েকটি ভালো বছরের ওপর নির্ভর করে ঋণ শোধ বা পাল সম্প্রসারণ করেন। এ বছর ঋণের সুদের হার বেশি, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও সারে বাড়তি খরচ, খরায় খাদ্যের বাড়তি খরচ এবং কানসাস ও নেব্রাস্কায় ধ্বংসাত্মক দাবানলের মতো চাপ ছিল। বাসিঞ্জারের ভাষ্য, গরু ও বাছুর পালনকারী খামারিরা সাধারণভাবে এ বছর ভালো করেছেন এবং কানসাসে তাঁরা মুনাফা দিয়ে মেরামত ও উন্নয়ন করছেন, তবে সেই সহায়তা আরও কিছুদিন থাকা দরকার। অ্যান্ডারসন বলেন, খামারিরা আশা করেছিলেন ২০২৬ সাল একটি পরিবর্তনের বছর হবে, তবে এখন পর্যন্ত পাল সম্প্রসারণের তেমন প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।



