যুব উন্নয়নের প্রশ্ন ফাঁস: সাত আসামির দুই দিনের রিমান্ড, আদালতে আসামির জবাব 'শালা-সম্বন্ধীরা পরীক্ষার্থী ছিল'

যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার সাত আসামির প্রত্যেকের দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন ঢাকার আদালত। রোববার শুনানি শেষে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এই আদেশ দেন।
রিমান্ডে যাওয়া আসামিরা হলেন মো. মফিজুল ইসলাম (২৭), মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), মো. হাসিনুর রহমান ওরফে সুজন (৩২), আসাদুল ইসলাম (৩১), এস এম এমদাদুল রহমান (৩৫), মো. জাহাঙ্গীর আলম (৩৮) ও নূর মোহাম্মদ (৩০)।
আসামিদের মধ্যে নূর মোহাম্মদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অফিস সহায়ক। মো. জাহাঙ্গীর আলম ও এস এম এমদাদুল রহমান কম্পিউটার অপারেটর, আসাদুল ইসলাম প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক এবং রুবেল ইসলাম পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর। মফিজুল ইসলাম ও হাসিনুর রহমান প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী চক্রের সদস্য বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার শুরু ১০ অক্টোবর। ওই দিন যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা নিয়োগ পরীক্ষার কিছু সময় আগে ফেসবুকে প্রশ্নপত্র ও উত্তর ছড়িয়ে পড়ে। ছড়িয়ে পড়া প্রশ্নের সঙ্গে আসল প্রশ্নের মিল পাওয়া যাওয়ায় পরীক্ষা শুরুর কিছুক্ষণ আগে তা স্থগিত করা হয়। পরে প্রশ্নপত্র ফাঁসে যুক্ত থাকার অভিযোগে এই সাতজনকে গ্রেপ্তার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, চক্রের সদস্যরা ১০ লাখ টাকায় প্রশ্ন ও উত্তর পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে পরীক্ষার্থীদের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন। আসামিদের কাছ থেকে ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, চাকরিপ্রার্থীদের ১০টি সনদ, ৪০ জনের ব্যাংক চেকের পাতা ও ব্যাংকের চেক বই জব্দ করা হয়।
রোববার দুপুরে সাত আসামিকে আদালতে হাজির করে প্রত্যেকের সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মো. মোহাইমিনুল ইসলাম। আবেদনে তিনি বলেন, আসামিরা বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস চক্রের সক্রিয় সদস্য; চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে নগদ টাকা ও চেকের মাধ্যমে বিপুল অর্থ নিয়ে পরীক্ষার আগে প্রশ্ন সরবরাহ ও উত্তর মুখস্থ করিয়ে দেওয়ার চুক্তি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, এই চক্রের সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের আরও অনেকে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মামলার ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। আরও তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং চক্রের অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারের জন্য তাঁদের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। জামিনে মুক্তি পেলে তদন্ত ব্যাহত হওয়া এবং আসামিদের পলাতক হওয়ার আশঙ্কার কথাও আবেদনে বলা হয়।
শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে আসছে এবং তারা একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তাদের কাছ থেকে বিপুল সংখ্যক চাকরিপ্রার্থীর প্রবেশপত্র, ব্যাংকের চেক ও প্রশ্ন লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে রিমান্ড প্রয়োজন বলে তিনি আদালতকে জানান।
আসামি এস এম এমদাদুল রহমানের পক্ষে শুনানি করেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আইনবিষয়ক সম্পাদক ও ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম। তিনি আদালতকে বলেন, এই আসামি এজাহারভুক্ত নন, তাঁর কাছ থেকে কোনো আলামত পাওয়া যায়নি এবং তিনি নির্দোষ; হয়রানি করার জন্য তাঁকে এই মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রিমান্ড আবেদনেও তাঁর ব্যাপারে বিশেষ কিছু লেখা নেই বলে তিনি উল্লেখ করেন। এ পর্যায়ে বিচারক তাঁকে বলেন, 'আপনি মেরিটে কথা বলেন। আপনি শুনানির প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলবেন। অন্য প্রসঙ্গে কথা বলবেন না।'
এরপর বিচারক তদন্ত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসা করেন, এই আসামির কাছ থেকে কোনো আলামত পাওয়া গেছে কি না। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, 'জি, বেশ কিছু আলামত পাওয়া গেছে। তিনি এই চক্রের গুরুত্বপূর্ণ একজন।'
আসামি আসাদুল ইসলামের পক্ষে তাঁর আইনজীবী আলমগীর হোসেন রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন এবং বলেন, আসাদুল নির্দোষ, এ ঘটনায় তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তখন আদালতের নথি দেখে বিচারক আসাদুলকে বলেন, তাঁর কাছে ও ফোনে অনেকগুলো স্ট্যাম্প ও চেক পাওয়া গেছে; চেকের ৪৫টি পাতা পাওয়া গেছে। বিচারক জানতে চান, এগুলো তাঁর কাছে কেন এবং এগুলো দিয়ে তিনি কী করতেন।
জবাবে আসাদুল ইসলাম বলেন, তিনি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরি করেন। বিচারক আবার জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে এতগুলো চেক ও স্ট্যাম্প তাঁর কাছে কেন। আসাদুল বলেন, তাঁর একটা ছোট ব্যবসা আছে। বিচারক বলেন, সরকারি চাকরি করে তিনি ব্যবসা করতে পারেন কি না, আইনে তা আছে কি না। উত্তরে আসাদুল বলেন, ব্যবসা তাঁর স্ত্রীর নামে। এরপর বিচারক এতগুলো নথি ও প্রবেশপত্র তাঁর কাছে কেন জানতে চাইলে আসাদুল বলেন, 'আমার শালা-সম্বন্ধী পরীক্ষার্থী ছিল।' বিচারক বলেন, 'কিন্তু আপনার ফোনে কেন? আর এতগুলো! কী করতেন এগুলো?'
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কাওসার আহম্মেদ আসামিপক্ষের বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রম করে আসছেন, যার প্রমাণ প্রাথমিকভাবে তদন্ত কর্মকর্তা পেয়েছেন। তাঁরা আরও ১১টি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরিকল্পনা করেছিল বলেও তিনি আদালতকে জানান। তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, সাতজন আসামির প্রত্যেকে প্রত্যেকের সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁদের কার্যক্রম বিস্তৃত। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে আদালত প্রত্যেক আসামির দুই দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।




