মক্কার মসজিদে অভিযোগে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড, প্রশ্ন উঠেছে ‘তাজির’ শাস্তিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় কি না

সৌদি আরবের মক্কার একটি মসজিদে ‘অনৈতিক কর্মকাণ্ডে’ জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার দুই বাংলাদেশি নাগরিককে সম্প্রতি আদালত দোষী সাব্যস্ত করে শরিয়া আইনে ‘তাজির’ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতি অনুযায়ী, ওই দুই বাংলাদেশিকে মক্কার মসজিদের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
এই রায়ের পরই প্রশ্ন উঠেছে, ‘তাজির’ হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় কি না। কারণ তাজির বলতে এমন শাস্তি বোঝায়, যার ধরন ও পরিমাণ কোরআন-সুন্নাহয় নির্ধারিত নেই; পরিস্থিতি বিবেচনা করে বিচারক বা শাসক তা ঠিক করেন।
ক্লাসিক্যাল ফিকহে তাজিরে মৃত্যুদণ্ড সাধারণ নিয়ম নয়। তবে কোনো কোনো মাজহাবের ফকিহেরা শাসকের ‘সিয়াসাহ’ বা রাষ্ট্রনীতির অধীনে সীমিত ব্যতিক্রম স্বীকার করেছেন।
ইসলামি ফৌজদারি আইনে শাস্তি সাধারণত তিন ভাগে আলোচিত হয়। প্রথমটি হুদুদ, যা কোরআন-হাদিসে নির্ধারিত শাস্তি; দ্বিতীয়টি কিসাস ও দিয়াত, অর্থাৎ হত্যা ও আঘাতের ক্ষেত্রে সমতাভিত্তিক প্রতিশোধ বা রক্তপণ; আর তৃতীয়টি তাজির।
‘তাজির’ শব্দের মূল ‘আজার’, যার ভাব হলো বাধা দেওয়া ও শাসন করা। পরিভাষায় এটি এমন শাস্তি, যা হুদুদ ও কিসাসের আওতার বাইরের অপরাধে সংশোধন ও প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা হয়। আবদুল কাদির আউদা তাঁর ‘আত-তাশরিউল জিনায়ি আল-ইসলামি মুকারিনান বিল কানুনিল ওয়াদয়ি’ গ্রন্থে এই সংজ্ঞা আলোচনা করেছেন; বইটি বৈরুতের মুআসসাসাতুর রিসালাহ থেকে প্রকাশিত।
তাজিরের ধরন বিচারকের বিবেচনার ওপর নির্ভর করে। ভর্ৎসনা, জরিমানা, সম্পদ বাজেয়াপ্তকরণ, কারাদণ্ড, নির্বাসন ও বেত্রাঘাত ক্লাসিক্যাল ফিকহে আলোচিত তাজিরের ধরনের মধ্যে রয়েছে। আধুনিক সৌদি ব্যবস্থায় আত্মসাৎ, ঘুষ ও সাইবার অপরাধের মতো অপরাধও তাজিরের আওতায় বিচার হয়।
হানাফি ফিকহে মূলনীতি হলো, তাজিরের শাস্তি সংশ্লিষ্ট হদের মাত্রা ছাড়াবে না। বেত্রাঘাতের সর্বোচ্চ সংখ্যা নিয়ে ইমামদের মধ্যে মতভেদ আছে। আল-মারগিনানি তাঁর ‘আল-হিদায়া শারহ বিদায়াত আল-মুবতাদি’ গ্রন্থে এই আলোচনা করেছেন (২/৫০৫, মাকতাবাতুল বুশরা, করাচি, ২০০৬)।
তাজিরের এই নমনীয়তা থাকায় বিচারক অপরাধের প্রকৃতি ও অপরাধীর অবস্থা বিবেচনা করে মানবিক বা কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আবার লিখিত ও সুনির্দিষ্ট আইন না থাকলে একই অপরাধে ভিন্ন বিচারকের হাতে ভিন্ন ফল হতে পারে।
কোরআনে সুরা মায়িদার ৩২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, কেউ কাউকে হত্যা করলে বা পৃথিবীতে ‘ফাসাদ’ বা বিপর্যয় সৃষ্টি না করলে তাকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমতুল্য। হাদিসে মুসলিমের রক্ত বৈধ হওয়ার তিনটি কারণ উল্লেখ আছে: জীবনের বদলে জীবন, বিবাহিত ব্যভিচারী এবং দীন ত্যাগ করে জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৮৭৮)।
অনেক ফকিহ এই হাদিস ও আয়াতকে মৃত্যুদণ্ডের সীমারেখা হিসেবে পড়েন। এই পাঠ অনুযায়ী তাজিরের মতো বিবেচনাভিত্তিক শাস্তিতে মৃত্যুদণ্ড সাধারণভাবে কাম্য নয়।
তবে ফিকহি ঐতিহ্য এখানেই থেমে থাকেনি। হানাফি ফিকহে ‘কাতল সিয়াসাতান’ বা রাষ্ট্রনীতিগত কারণে মৃত্যুদণ্ড নামে একটি ধারণা আলোচিত হয়েছে। তাতে শাসক বারবার সংঘটিত ও ব্যাপক ক্ষতিকর অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হিসেবে এমন দণ্ড দিতে পারেন, যদি অন্য উপায়ে ক্ষতি ঠেকানো না যায়। ইবনে আবিদিন তাঁর ‘রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররুল মুখতার’ গ্রন্থে এই ধারণা আলোচনা করেছেন (দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯২)।
মালিকি ও হাম্বলি ধারায় গুপ্তচরবৃত্তি, দীনে বিকৃতি প্রচার এবং বারবার ভয়াবহ অপরাধের মতো ক্ষেত্রে তুলনামূলক বিস্তৃত ব্যতিক্রমের আলোচনা পাওয়া যায়। শাফেয়ি ধারা সাধারণত অধিক সংযত। কুয়েতের ধর্ম ও ওয়াকফ মন্ত্রণালয়ের ‘আল-মাওসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ’ গ্রন্থের তাজির ভুক্তিতে এই মতভেদের আলোচনা রয়েছে।
ইমাম ইবনে তাইমিয়ার ‘আস-সিয়াসাহ আশ-শরইয়্যাহ’ গ্রন্থের আলোচনাও শাসকের এই বিবেচনামূলক এখতিয়ারের একটি প্রভাবশালী উৎস। ইবনে তাইমিয়া উল্লেখ করেছেন, যারা সমাজে ব্যাপক মাত্রায় মাদক বা নেশাজাতীয় দ্রব্য ছড়ায় এবং যাদের অনিষ্ট থেকে সমাজকে রক্ষার আর কোনো উপায় থাকে না, রাষ্ট্র চাইলে তাদের মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে (আস-সিয়াসাহ আশ-শারিইয়্যাহ, পৃষ্ঠা ১৩৫, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১৯৯৮)।
এসব মতে মৃত্যুদণ্ড কোনো নিয়মিত শাস্তি নয়; এটি ‘শেষ উপায়’ হিসেবে বিবেচিত, যখন কম কঠোর শাস্তিতে ক্ষতি রোধ অসম্ভব এবং ক্ষতি সমাজব্যাপী। ফিকহে ‘শুবহা’ বা সন্দেহের সুবিধার নীতিও ফৌজদারি বিচারে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। ইনতিসার এ. রাব তাঁর ‘ডাউট ইন ইসলামিক ল’ বইয়ে এই নীতি আলোচনা করেছেন (ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, ক্যামব্রিজ, ২০১৫)।
এ কারণে বহুল প্রচলিত বর্ণনা যে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ ফকিহ তাজিরে মৃত্যুদণ্ড অবৈধ বলেছেন, আর রাষ্ট্র চাইলে ব্যতিক্রম করতে পারে’—তা আংশিক সত্য। সঠিক চিত্র হলো, মাজহাবভেদে মতভেদ আছে এবং ব্যতিক্রমের পরিধি ও শর্ত নিয়ে ফকিহদের মধ্যে ভিন্নমত আছে।
তাজির ইসলামি আইনের একটি বৈধ ও প্রয়োজনীয় শ্রেণি; এটি সংশোধন ও প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে বিচারককে নমনীয়তা দেয়। ক্লাসিক্যাল ফিকহে এর মূল সুর সংযম: জীবনের পবিত্রতা নীতির মর্যাদা পায়, আর মৃত্যুদণ্ড সিয়াসাহ-ভিত্তিক সংকীর্ণ ব্যতিক্রম হিসেবে আলোচিত। ফলে ‘তাজিরে মৃত্যুদণ্ড যায় কি না’ প্রশ্নের আগে নিশ্চিত করা জরুরি, আধুনিক রাষ্ট্রে সেই শাস্তি দেওয়ার শর্তগুলো লিখিত আইন, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব ও কনস্যুলার সুরক্ষার মাধ্যমে বাস্তবে নিশ্চিত হচ্ছে কি না।


