ছয় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকেই এখন নিয়মিত এমডি নেই: দুই দফায় সরানো হলো অন্তর্বর্তী আমলের নিয়োগপ্রাপ্তদের

রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয়টি বাণিজ্যিক ব্যাংকে এখন কোনো নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নেই। সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল) ও বেসিক ব্যাংক—ছয় ব্যাংকেই এই শূন্যতা তৈরি হয়েছে।
এবার অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া এমডিদের সরিয়ে দিয়েছে বিএনপি সরকার। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালেও একবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার এক সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিন বছরের জন্য নিয়োগ পাওয়া ছয় এমডিকে সরিয়ে দিয়েছিল। এবার দুই দফায় সরানো হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া এমডিদের।
প্রথম দফায় গত ২ সেপ্টেম্বর অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মো. আনোয়ারুল ইসলাম, বেসিক ব্যাংকের মো. কামরুজ্জামান খান এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) মো. জসিম উদ্দিনের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করা হয়।
দ্বিতীয় দফায় ১৯ অক্টোবর একইভাবে বাতিল করা হয় সোনালী ব্যাংকের এমডি মো. শওকত আলী খান, জনতা ব্যাংকের মো. মজিবুর রহমান এবং রূপালী ব্যাংকের কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলামের অবশিষ্ট মেয়াদ।
দুই ঘটনার মধ্যে সময়ের ব্যবধান থাকলেও একটি মিল স্পষ্ট বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সেটি হচ্ছে, নিয়োগের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরকার বদলের পর এমডিদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এতে ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা, নিয়োগের স্থায়িত্ব এবং পেশাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে পদে থাকার নিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এবারের অপসারণের পেছনে আগেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নির্দেশনার পর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর পর্ষদ চেয়ারম্যানদের চিঠি পাঠিয়ে এমডিদের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিলের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলে।
এমডিদের সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি নতুন নিয়োগের পথও সহজ করা হয়েছে। গত সোমবার সংশোধন করা হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নসংক্রান্ত নীতিমালা। নতুন নিয়মে ডিএমডি পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা না থাকলেও এমডি হওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২০ বছর কাজ করার অভিজ্ঞতার শর্ত বহাল রয়েছে।
ছয় ব্যাংকে নতুন এমডি নিয়োগের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। আগামী সপ্তাহের শুরুতে একযোগে নিয়োগ দেওয়ার কথা জানা গেছে। নতুন এমডি নিয়োগের আগে গোয়েন্দা প্রতিবেদন নেওয়ার প্রক্রিয়াও শেষ হয়েছে।
তবে কয়েকটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে অসত্য তথ্য পাওয়া গেছে বলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্রে জানা গেছে। একজন ব্যাংকার কখনো শাখা ব্যবস্থাপক ছিলেন না, অথচ প্রতিবেদনে তাঁর বিরুদ্ধে শাখা ব্যবস্থাপক থাকার সময়ের অনিয়মের অভিযোগ তুলে আনা হয়েছে। আরেকজনের বিরুদ্ধে দুদকে মামলা থাকার কথা বলা হলেও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ দুদক থেকে তথ্য নিয়ে কোনো মামলার অস্তিত্ব পায়নি। বিষয়গুলো অর্থমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে বলে সূত্রগুলো জানায়।
ব্যাংকাররা বলছেন, রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের এমডি পদ কোনো সরকারের পছন্দের ব্যক্তিকে বসানোর জায়গা হওয়া উচিত নয়। এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ, ঋণ ব্যবস্থাপনা, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ ও সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত জড়িত বলে তাঁরা উল্লেখ করেছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকার বদলালেই এমডি বদলে যাওয়ার সংস্কৃতি চলতে থাকলে ব্যাংক পরিচালনায় পেশাদারত্বের বদলে রাজনৈতিক আনুগত্যের গুরুত্ব বাড়তে পারে। এখন দেখার বিষয়, সরকার কাদের নিয়োগ দেয় এবং কীভাবে তাঁদের বেছে নেয়।




