হেবরনে বুলডোজারে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ৫০ বছরের কারখানা: ইসরায়েলি অভিযানে ধ্বংসের মুখে শহরের ব্যবসা-বাণিজ্য
অধিকৃত পশ্চিম তীরের হেবরন শহরের ফার্শ আল-হাওয়া এলাকায় নিজের কারখানার ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন সুফিয়ান আল-কাওয়াসমি; ইসরায়েলি বুলডোজারের নিচে তাঁর সারা জীবনের গড়া ব্যবসা ধ্বংস হয়ে গেছে।
শুক্রবার সকালে হেবরনের পশ্চিম প্রবেশপথের কাছে দুই ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীর হামলায় দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হওয়ার পর কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা বা নোটিশ ছাড়াই কারখানাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়; হামলাকারী দুজনও নিহত হন। এরপর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হেবরনজুড়ে বড় ধরনের সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেন এবং অবৈধভাবে দখলকৃত পশ্চিম তীরে আরও বিস্তৃত অবরোধের প্রস্তুতির নির্দেশ দেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই ধ্বংসযজ্ঞকে সমষ্টিগত শাস্তি বলে নিন্দা করেছে। ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ ধ্বংসযজ্ঞের পক্ষে যুক্তি দিয়ে একে ‘প্রতিরোধ তৈরি করা এবং মূল্য আদায়’ বলে বর্ণনা করেছেন।
কাওয়াসমির পরিবারের প্রথম কারখানাটি সিরামিক পণ্য তৈরি করত এবং এর বয়স তাঁর নিজের বয়সের সমান—৫০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত। এর ১৫ বছর পর পরিবারটি মার্বেল কারখানা খোলে। ব্যবসাটি পশ্চিম তীরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল, পণ্য রপ্তানি হতো ইসরায়েলেও, এবং ৭০ জনের বেশি মানুষের জীবিকা চলত এই প্রতিষ্ঠানে।
শুক্রবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সিরামিক কারখানা ও মার্বেল কারখানা দুটিই মাটিতে মিশে যায়; ধ্বংস হয় আশপাশের আরও কয়েকটি ভবন, একটি তিনতলা বাড়ি ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা। একই সময়ে শহরের সব প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া হয়, অভিযান ও গ্রেফতার চলে এবং ৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে ঘর থেকে জোর করে সরিয়ে দেওয়া হয়।
কাওয়াসমি বলেন, ধ্বংসযজ্ঞ শুরুর আগে গুদাম ও কারখানা থেকে মালামাল সরানোর কোনো সুযোগ তাঁকে দেওয়া হয়নি; মজুত পণ্য ধ্বংসস্তূপের নিচেই চাপা পড়ে আছে। তিনি বলেন, ‘আমরা কিছু মার্বেল স্ল্যাব উদ্ধার করে কাছাকাছি বন্ধুদের স্থাপনায় রাখতে পেরেছি, কিন্তু বেশির ভাগ মজুতই ধ্বংস হয়ে গেছে।’
তাঁর হিসাবে, অফিসসহ পরিবারের ব্যবসার ১ হাজার ৩০০ বর্গমিটার সম্পত্তি ধ্বংস হয়েছে এবং ক্ষতির পরিমাণ ৬ কোটি শেকেলের (১ কোটি ৯০ লাখ ডলার) কম নয়।
হেবরন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, হেবরন ফিলিস্তিনি অর্থনীতির প্রধান স্তম্ভ—ফিলিস্তিনের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪২ শতাংশ আসে এই শহর থেকে। এখানে ২৩ হাজারের বেশি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার মধ্যে ৫ হাজারের বেশি শিল্প ও কারুশিল্প প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন; পাথর ও মার্বেল, প্লাস্টিক, ধাতু, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, চামড়া ও জুতা এবং কাচসহ নানা খাত নিয়ে শহরের অর্থনীতি বিচিত্র।
চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট আদনান আল-নাতশা বলেন, ইসরায়েলি অভিযানে মোট ক্ষতির সুনির্দিষ্ট হিসাব এখনো পাওয়া যায়নি; ব্যবসা ও বাড়িঘরের ক্ষতি নিরূপণের কাজ চলছে, যার পরিমাণ কয়েক মিলিয়ন ডলার হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। শহরের এলাকা বন্ধ করে দেওয়া, বাসিন্দাদের উচ্ছেদ, ভবন ধ্বংস ও দোকানপাট বন্ধের কারণে ইতিমধ্যে কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে বলে তিনি জানান; কর্মীরা কর্মস্থলে পৌঁছাতে না পারায় মালিকেরা প্রতিষ্ঠান চালাতে পারছেন না, আর এর প্রভাব শুধু হেবরনে নয়, পুরো ফিলিস্তিনি অর্থনীতিতে পড়ছে।
শহরের আল-জালাদা এলাকার সবজি বিক্রেতা ইব্রাহিম আহমারো বলেন, শুক্রবার তিনি শনিবারের জন্য মাল সাজাচ্ছিলেন—শনিবার সাধারণত সবচেয়ে ব্যস্ত দিন, কারণ সস্তায় পণ্য কিনতে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের বাস আসে। সামরিক যান হঠাৎ এলাকায় ঢুকে সেনারা তাঁকে অবিলম্বে দোকান ছেড়তে বাধ্য করে; পণ্য নষ্ট হওয়া ঠেকাতে ফ্রিজ চালু করার বা সামনে পার্ক করা গাড়িটি সরানোর সুযোগও তিনি পাননি। রোববার সকালে ফিরে মাল দেখতে গেলে দোকানের ভেতরেই সেনারা তাঁর ওপর হামলা করে তাড়িয়ে দেয়; অনেক অনুরোধের পর কয়েক মিনিট সময় পেয়ে তিনি কয়েক ক্রেট মাল বের করতে পারেন। সেগুলো দোকান থেকে ৪০০ মিটার দূরে রেখে দেন, যাতে অবরুদ্ধ এলাকার বাসিন্দারা প্রয়োজনমতো নিতে পারেন; শুধু এই পণ্যেই তাঁর ক্ষতি ৫০ হাজার শেকেলের (১৬ হাজার ২০০ ডলার) বেশি।
অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ আলি ওয়েইউই বলেন, যানবাহন ভাঙার ওয়ার্কশপ, খুচরা যন্ত্রাংশের দোকান ও টাইলসের দোকান ধ্বংসে ক্ষতি হয়েছে আনুমানিক ৭ থেকে ৮ কোটি শেকেল (২ কোটি ২৭ লাখ থেকে ২ কোটি ৬০ লাখ ডলার); এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কয়েক ডজন, এমনকি শতাধিক যানবাহন জব্দ করা হয়েছে। তাঁর মতে, অভিযান এক-দুই দিনের মধ্যে শেষ হলে অর্থনীতি অপেক্ষাকৃত দ্রুত ঘুরে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু ১০ দিনের বেশি চললে পণ্য জমে যাওয়া, পরিবহন বিঘ্ন ও উৎপাদনশীলতা হ্রাসসহ বড় সমস্যা দেখা দেবে।
চেকপয়েন্ট, মাটির বাঁধ ও কংক্রিটের ব্লক বসিয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হেবরন অবরুদ্ধ রেখে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে এবং এই অবরোধ কখন শেষ হবে, তা ঘোষণা করা হয়নি; আগামী মঙ্গলবার ইসরায়েলে নতুন পার্লামেন্ট নির্বাচনের ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।




