গোপনে হোম অফিসজুড়ে বসানো হয়েছে এআই, অভিবাসনে ‘ডিজিটাল শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশ’ নিয়ে প্রতিবেদন

ব্রিটেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হোম অফিসের কাজে প্রায় সম্পূর্ণ গোপনীয়তার মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বসানো হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ওপেন রাইটস গ্রুপের (ওআরজি) গবেষণা অনুযায়ী, এই প্রযুক্তির বিস্তার অভিবাসনের ক্ষেত্রে তথাকথিত 'শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশ'কে আরও শক্তিশালী করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্দেহভাজন ভুয়া বিয়ে শনাক্ত করা থেকে শুরু করে আশ্রয়প্রার্থীদের বয়স নির্ধারণ এবং নতুন আগতদের ফোনের ভেতরের তথ্য যাচাই পর্যন্ত নানা কাজে এখন এআই ব্যবহার হচ্ছে।
সীমান্ত নজরদারিতেও এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। লাইভ ফেসিয়াল রিকগনিশন, এআইচালিত ড্রোন ও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সীমান্তে নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আশ্রয় সাক্ষাৎকারের সারসংক্ষেপ তৈরি এবং সেই সাক্ষাৎকারে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত দেশ-সংক্রান্ত নীতিমালার তথ্য সাজাতেও এআই ব্যবহার হচ্ছে। এ ছাড়া 'আইডেন্টিফাই অ্যান্ড প্রায়োরিটাইজ ইমিগ্রেশন কেসেস' (আইপিক) নামের একটি অস্বচ্ছ টুলের মাধ্যমে মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটির তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে হোম অফিসের সীমিত প্রকাশিত তথ্য, তথ্য অধিকার (ফ্রিডম অব ইনফরমেশন) অনুরোধ এবং সংসদ সদস্যদের প্রশ্ন থেকে। 'অটোমেটেড ডিসক্রিমিনেশন: আনপ্যাকিং দ্য ডিজিটাল হোস্টাইল এনভায়রনমেন্ট' শীর্ষক প্রতিবেদনটির প্রতি দলমতের ঊর্ধ্বে সমর্থন জানিয়েছেন লেবার দলের বেল রিবেইরো-অ্যাডি, স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির পিট উইশার্ট এবং গ্রিন পার্টির সিয়ান বেরি।
প্রতিবেদনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, এআই নিরপেক্ষ বা নির্ভুল নয়; এটি সমাজের ভেতরের পক্ষপাত ও বৈষম্যকে প্রতিফলিত করতে পারে, বিশেষ করে যখন এর ব্যবহারের মূল চালিকা শক্তি অভিবাসনবিরোধী নীতি ও বক্তব্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই প্রায় সম্পূর্ণ গোপনে পরীক্ষা ও প্রয়োগ করা হচ্ছে। কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে জাতীয় নিরাপত্তার কথা বলে তথ্য অধিকারের অনুরোধ আটকে দিচ্ছেন এবং প্রকাশিত তথ্য কাটছাঁট করছেন।
প্রতিবেদনে 'মানুষকে তথ্যের বিন্দুতে পরিণত করা'র প্রবণতার সমালোচনা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এটি ২০১২ সালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালীন টেরিজা মের কল্পনা করা সেই শত্রুভাবাপন্ন পরিবেশকেই পুনরায় তৈরি করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, 'কে এখানে থাকতে পারবে আর কাকে বিপদের মধ্যে ফেরত পাঠানো হবে, তা ঠিক করতে এআইয়ের ওপর নির্ভর করা গভীরভাবে উদ্বেগজনক পদক্ষেপ।'
ওপেন রাইটস গ্রুপ সরকারের কাছে এআই নিয়ন্ত্রণ এবং অগণতান্ত্রিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঝুঁকি তৈরি করে এমন ব্যবহার নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে; এর মধ্যে আশ্রয় আবেদনে চ্যাটজিপিটির মতো টুলের ব্যবহারের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
সংগঠনটি আরও বেশি স্বচ্ছতা, শক্তিশালী তথ্য অধিকার আইন, জাতীয় নিরাপত্তার সংকীর্ণতর সংজ্ঞা এবং সরকারি এআই টুলগুলোর একটি মজবুত পাবলিক রেজিস্টার দাবি করেছে।
বেল রিবেইরো-অ্যাডি বলেছেন, প্রশ্ন ও অনুরোধ সত্ত্বেও হোম অফিস আশ্রয় প্রক্রিয়ায় এআই কীভাবে ব্যবহৃত হয়, সমস্যাগুলো কী এবং সেগুলো কীভাবে সামলানো হচ্ছে, তা ব্যাখ্যা করে এমন নথি প্রকাশে অনীহা দেখিয়েছে। তিনি বলেছেন, এই টুলগুলো ব্যর্থ হলে জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা বিভাগটি ব্যাখ্যা করেনি; সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা ও ক্ষমতাহীন মানুষদের কেন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি বহন করতে হবে, তার যুক্তিও দেওয়া হয়নি।
ওপেন রাইটস গ্রুপের কর্মসূচি ব্যবস্থাপক সারা আলশেরিফ বলেছেন, 'অভিবাসন একটি মানবিক ঘটনা ও অভিজ্ঞতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ঠিক করা যায় এমন কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়। এআই কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা সীমিত করতে আমাদের জরুরিভাবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ দরকার।'
হোম অফিসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার সীমান্ত রক্ষায় তাদের হাতে থাকা টুলগুলোর একটি মাত্র এবং এটি মানব সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের ভূমিকা প্রতিস্থাপন বা স্বয়ংক্রিয় করে না। তিনি বলেছেন, আশ্রয়ের সিদ্ধান্ত নেন প্রশিক্ষিত কেসওয়ার্কাররা; এআই টুল শুধু সাক্ষাৎকারের রেকর্ড ও নীতিমালার তথ্য খুঁজে পেতে সহায়তা করে, আলাদাভাবে ব্যবহার করা যায় না এবং দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয় না। মুখপাত্র আরও বলেছেন, তারা নিয়মিত এই টুলগুলোর কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণ করেন এবং এরই মধ্যে এগুলোর প্রয়োগ নিয়ে হালনাগাদ মূল্যায়ন প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।




