লন্ডনের অক্সফোর্ড স্ট্রিট এখন যানবাহনমুক্ত: পথচারীদের জন্য খুলল বিখ্যাত কেনাকাটার সড়ক
লন্ডনের বিখ্যাত অক্সফোর্ড স্ট্রিটের একটি অংশ এখন যানবাহনমুক্ত। সোমবার থেকে গ্রেট পোর্টল্যান্ড স্ট্রিট থেকে অর্চার্ড স্ট্রিট পর্যন্ত সড়কটি শুধু পথচারীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে; গাড়ি যেমন গেছে, বাসও আর এই অংশ দিয়ে চলছে না। বৃষ্টিভেজা ধূসর দিনে ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে জীববিজ্ঞানের শিক্ষক মুনিরা আলফাদেল এই বদলকে ‘জাদুকরী’ বলে বর্ণনা করেছেন।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ক্রেতারা অক্সফোর্ড স্ট্রিটে সাইকেল, গাড়ি, কালো ক্যাব আর লাল দোতলা বাসের পাশাপাশি হেঁটেছেন। মুনিরা আলফাদেল ছিলেন পথচারীকরণের পর সড়কের মাঝখান দিয়ে হাঁটা প্রথম ব্যক্তিদের একজন।
সোমবার সকালে অবশ্য অভ্যাসবশত বেশিরভাগ পথচারীই ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন। ফরেনসিক বিজ্ঞানী মার্ক আরবুইন ছিলেন অল্প কয়েকজনের একজন, যিনি সড়কের মাঝখান দিয়ে হেঁটেছেন। তিনি বলেন, সেদিন যানবাহন নেই দেখে তিনি মাঝখান দিয়ে হাঁটার সুযোগ নিয়েছেন; তার মতে এটি পরিবেশের জন্য ভালো, কেনাকাটার জন্য ভালো এবং সড়কে চলাচল অনেক সহজ করে দেয়।
এই ছোট্ট সড়কখণ্ডটি বড় ব্যবসার কেন্দ্র। প্রায় ১ কিলোমিটার (০.৬ মাইল) দীর্ঘ এই অংশজুড়ে যুক্তরাজ্যের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশ তৈরি হয়। এত গুরুত্ব সত্ত্বেও সাম্প্রতিক দশকগুলোতে অক্সফোর্ড স্ট্রিট ভোক্তা ব্যয় কমে যাওয়া, ভাড়া কমে যাওয়া এবং পথচারী কমে যাওয়ার ধাক্কা খেয়েছে; খুচরা ব্যবসায়ীদের সংগঠন নিউ ওয়েস্ট এন্ড কোম্পানির হিসাবে পথচারীর সংখ্যা এখন ২০০৬ সালের মাত্র ৫৭ শতাংশ।
গ্রেটার লন্ডন অথরিটি, অর্থাৎ সিটি হল, মনে করে পথচারীকরণ এই সড়কের জন্য প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পারে। সিটি হলের বিশ্লেষণ বলছে, অক্সফোর্ড স্ট্রিটের আংশিক পথচারীকরণে বছরে ১০ কোটি ৯০ লাখ ডলারের বেশি আয় হতে পারে এবং অতিরিক্ত ৭০০ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে এক সপ্তাহান্তের পরীক্ষামূলক পথচারীকরণের পর এলাকার দুই-তৃতীয়াংশ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জানিয়েছিল, তাদের বিক্রি বেড়েছে বা আগের মতোই ছিল।
এটি একটি বহু ধাপের পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের প্রথম ধাপ। প্রকল্পে দুটি নতুন পাবলিক স্কয়ার, ৫০টি গাছ এবং শত শত বসার আসন যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সবুজ ও হাঁটার উপযোগী শহরের পক্ষে প্রচার চালানো বারবারা স্টল সড়কটি দেখে হাসছিলেন। তার মতে বাতাস ইতিমধ্যে পরিষ্কার মনে হচ্ছে এবং শব্দ অনেক কমে গেছে। তিনি বলেন, টিউব থেকে উঠে মানুষ চারদিকে তাকিয়ে উত্তেজিত হচ্ছেন, যা দেখে তার মনে হয়েছে যেন বড়দিনের সকালে শিশুরা আনন্দ করছে।
তবে শনিবার, বদলের আগের দিন, সব ক্রেতা নিশ্চিন্ত ছিলেন না। একজন ফরাসি পর্যটক বলেছিলেন, বাস ও ক্যাব আর চলতে না দিলে তিনি অক্সফোর্ড স্ট্রিট পুরোপুরি এড়িয়ে চলবেন। আরেকজন ক্রেতা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কথা তুলে ধরেন, যারা বেশি হাঁটতে পারেন না; তাদের জন্য বাস চলাচল বন্ধ না হওয়াই সহায়ক হতো বলে তিনি মনে করেন। কখনো ক্লান্তি বা বৃষ্টির সময় বাসের প্রয়োজন হয় বলেও তিনি বলেন।
অক্সফোর্ড স্ট্রিটের পথচারীকরণ বহু বছর ধরে চলা প্রচেষ্টার ফল, বিতর্কও কম হয়নি। লন্ডনের মেয়র সাদিক খান ২০১৭ সালে নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রথমবার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ২০১৮ সালে পরিকল্পনা ভেস্তে যায়, যখন তখনকার দায়িত্বে থাকা ওয়েস্টমিনস্টার কাউন্সিল সমর্থন প্রত্যাহার করে নেয় এবং বলে, বাসিন্দারা এই পরিকল্পনা সমর্থন করছেন না।
জনপরামর্শের পর খান অক্সফোর্ড স্ট্রিট ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন তৈরি করেন। এর মাধ্যমে সড়কটির দায়িত্ব স্থানীয় কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সরিয়ে গ্রেটার লন্ডন অথরিটি ও ট্রান্সপোর্ট ফর লন্ডনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এই দ্বিতীয়, সফল প্রচেষ্টার পরও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সন্দেহ দূর হয়নি।
ওয়েস্টমিনস্টারের ডেপুটি লিডার এবং গ্রোথ ও পরিকল্পনাবিষয়ক ক্যাবিনেট সদস্য কাউন্সিলর টিম বার্নস বলেছেন, বাসিন্দাদের কথা শোনা হচ্ছে না। তার মতে যোগাযোগ প্রক্রিয়াটি অনেকটাই একমুখী হয়েছে; বাসিন্দাদের শুধু জানানো হচ্ছে কী হতে যাচ্ছে। তিনি মনে করেন অর্থনৈতিক সুফল অতিরঞ্জিত করা হচ্ছে এবং একটি বড় সড়ক থেকে বাসের রুট আশপাশের ছোট সড়কগুলোতে সরিয়ে দেওয়ার প্রভাব বিবেচনা করা হয়নি। বাসিন্দা নেরমা ক্রিজও একই আশঙ্কা করে বলেছেন, লন্ডনের ওয়েস্ট এন্ড ‘সম্পূর্ণ বাসের অযোগ্য, অতিরিক্ত ভিড় ও রাতে অতিরিক্ত কোলাহলপূর্ণ’ হয়ে উঠবে।
স্টলের বিশ্বাস, আগামী মাসগুলোতে বাস্তব ফলাফল দেখলে বাসিন্দাদের উদ্বেগ কেটে যাবে। তার মতে ইউরোপ ও বিশ্বের অন্য জায়গার উদাহরণ প্রমাণ করে এ ধরনের প্রকল্প বাসিন্দাদের জীবন সামগ্রিকভাবে ভালো করে, খুচরা ব্যবসায় গতি আনে, বায়ুদূষণ কমায় এবং মানুষ জায়গাটি নিজেদের করে নেয়। অক্সফোর্ড স্ট্রিট ডেভেলপমেন্ট করপোরেশন আগামী মাসগুলোতে পথচারীকরণের ফলাফল পরীক্ষা ও পর্যালোচনা করবে এবং আগামী বছরের শুরুর দিকে তার ফলাফল প্রকাশ করবে। অক্সফোর্ড স্ট্রিটের বাকি অংশকে স্থায়ীভাবে যানবাহনমুক্ত জনপরিসরে রূপ দেওয়ার কাজ আগামী বছরের শেষ নাগাদ এগিয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৮ সালের মেয়র নির্বাচনের আগে এই পথচারীকরণ হতে পারে সাদিক খানের স্বাক্ষর করা শেষ বড় উদ্যোগগুলোর একটি।



