ব্লাসফেমি মামলায় খ্রিস্টান কায়সার আইয়ুবের মৃত্যুদণ্ড বহাল পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্টে, খালাস পেলেন ভাই আমুন

পাকিস্তানের সুপ্রিম কোর্ট ব্লাসফেমির অভিযোগে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী কায়সার আইয়ুবের দোষী সাব্যস্ত হওয়া ও মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রেখেছেন। একই মামলায় তাঁর ভাই আমুন আইয়ুবকে খালাস দেওয়া হয়েছে। ৭ অক্টোবরের রায়ে আমুন প্রায় ১০ বছর কারাগারে থাকার পর মৃত্যুদণ্ড থেকে মুক্তি পান, আর কায়সারের সাজা বহাল থাকে।
আমেরিকান সেন্টার ফর ল অ্যান্ড জাস্টিসের (এসিএলজে) জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি ও আন্তর্জাতিক আইন পরিচালক সিসি হেইল জানিয়েছেন, আইয়ুব ভাইদের বিরুদ্ধে মামলাটি শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। একটি ওয়ার্ডপ্রেস সাইটে দুই ভাইয়ের যোগাযোগের তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর সেখানে মহানবী (সা.)-কে অবমাননাকর বিষয়বস্তু ছড়ানো হয়েছে—এমন অভিযোগের ভিত্তিতে কায়সারকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরের বছর গ্রেপ্তার হন আমুন।
হেইলের ভাষ্য, এরপর ১২ বছর ধরে চলা আইনি লড়াইয়ে পাকিস্তানের বিচারব্যবস্থা কখনোই এমন প্রমাণ হাজির করতে পারেনি, যা থেকে দেখা যায় যে ভাইদের কেউ সত্যিকার অর্থে ওই ওয়ার্ডপ্রেস ব্লগ সাইটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এসিএলজে তার পাকিস্তানি সহযোগী সংগঠন অর্গানাইজেশন ফর লিগ্যাল এইডের (ওএলএ) মাধ্যমে ২০১৫ সালে আমুনের গ্রেপ্তারের পরপরই তাঁর পক্ষে আইনি লড়াই শুরু করে।
২০১৮ সালে দুই ভাইকেই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২২ সালে লাহোর হাইকোর্টে তাঁদের আপিল সফল হয়নি। ২০২৫ সালে সুপ্রিম কোর্টে মামলাটি চলমান থাকার একপর্যায়ে কায়সার ওএলএকে তাঁর পক্ষে লড়তে অনুরোধ করেন।
বছরের পর বছর যুক্তিতর্ক আর ১৩ বার শুনানি স্থগিত হওয়ার পর সুপ্রিম কোর্ট ৭ অক্টোবর রায় দেন। সেই রায়ে আমুন খালাস পেলেও কায়সারের দোষী সাব্যস্ত হওয়া ও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকে। রায় ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
হেইল বলেন, ব্লাসফেমি মামলার শুনানিতে এখন হুমকির পরিবেশ বিরাজ করে এবং আদালতকক্ষে প্রায়ই জনতার ভিড় দেখা যায়। তিনি এক ভিডিওর কথা উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছে, বিচারক ফাঁসির রায় কার্যকর না করলে তাঁরা নিজের হাতেই বিচারককে হত্যা করবেন।
তাঁর ভাষ্য, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় যে নজির তৈরি করল, তা ব্লাসফেমির অভিযোগে এখন কারাগারে থাকা প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে ওএলএর অন্তত তিনজন মক্কেলও রয়েছেন।
মৃত্যুদণ্ডের মুখে থাকা অন্য খ্রিস্টানদের মধ্যে রয়েছেন শাহজাদ মাসিহ। ২০১৭ সালে ব্লাসফেমির অভিযোগ ওঠার সময় তাঁর বয়স ছিল ১৬ বছর। পাঁচ বছর পর তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২২ সালের পর থেকে তাঁর আপিল শুনানি বারবার স্থগিত হচ্ছে।
ইনতিজার মাসিহের বিচার এখনো চলমান; ২০২৩ সালে হোয়াটসঅ্যাপে ব্লাসফেমিমূলক পোস্ট শেয়ার করেছেন বলে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। আহসান মাসিহের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে টিকটকে ব্লাসফেমিমূলক বিষয়বস্তু পোস্ট করার অভিযোগ ওঠে এবং পরের বছর তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়; তাঁর আপিল শুনানিও স্থগিত হয়ে আসছে।
ওএলএ এ সপ্তাহের শুরুতেই সুপ্রিম কোর্টে রিভিউ আবেদন করার পরিকল্পনা করছে, যেখানে কায়সারকে দোষী সাব্যস্ত করার পক্ষে প্রমাণের ঘাটতির বিষয়টি তোলা হবে। সংগঠনটি কায়সারের জন্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমা চেয়ে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পরিকল্পনাও করছে।
ওপেন ডোরসের ২০২৬ সালের ওয়ার্ল্ড ওয়াচ লিস্টে পাকিস্তানকে সেই শীর্ষ ১০ দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে, যেখানে খ্রিস্টানরা সবচেয়ে চরম নিপীড়নের মুখে পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানসহ সারা বিশ্বে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং অন্য যেকোনো দেশের মতোই পাকিস্তানের সঙ্গেও তারা নিয়মিত এই উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা করে।
জাতিসংঘের কর্মকর্তারা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান সরকারকে লেখা এক চিঠিতে আইয়ুব ভাই ও শাহজাদ মাসিহের মামলা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। পাকিস্তান সরকার চলতি বছরের শুরুতে জবাবে জানায়, সংবিধান অনুযায়ী এ ধরনের বিষয় বিচার বিভাগের এখতিয়ারে পড়ে এবং নির্বাহী বিভাগের পক্ষে কোনো নির্দিষ্ট মামলায় হস্তক্ষেপ করা সাংবিধানিকভাবে নিষিদ্ধ। পাকিস্তানের ওয়াশিংটন দূতাবাস রাষ্ট্রপতির ক্ষমার সম্ভাবনা নিয়ে করা প্রশ্নের জবাব দেয়নি। হেইল বলেছেন, আমুন মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে গেলেও প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে তাঁকে নিরাপদ রাখতে তাঁদের কাজ চলমান রয়েছে।



