সাগর-রুনি হত্যা তদন্তে রোকেয়া প্রাচীর নাম প্রসিকিউশনের প্রাথমিক অনুসন্ধান থেকে, হাইকোর্ট ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দিলেন টাস্কফোর্সকে

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারওয়ার ও মেহেরুন নাহার রুনি হত্যা মামলার তদন্তে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর নাম এসেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের প্রাথমিক অনুসন্ধান থেকে। সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের সঙ্গে রোকেয়া প্রাচীর সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটররা। তবে সেই তথ্য এখনো যাচাই-বাছাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
মামলার তদন্তে গঠিত টাস্কফোর্সের অগ্রগতি প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) হাইকোর্টে প্রতিবেদনটির অংশ উপস্থাপন করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তদন্ত ও তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের জন্য রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ আগামী ২৯ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দিয়েছে।
গত ১৯ অক্টোবর টাস্কফোর্সের সদস্য সচিব ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আজিজুল হক অগ্রগতি প্রতিবেদনটি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ে দাখিল করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানান, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু ডিজিটাল আলামত জব্দ করেছে। এসব আলামতের মধ্যে ছিল বিভিন্ন জিওলোকেশন-সংক্রান্ত তথ্য, এসএমএস এবং কল ডিটেইল রেকর্ডের (সিডিআর) মুদ্রিত কপি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রসিকিউটর জোহা প্রাথমিক তদন্তে জিয়াউল আহসান ও একজন গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামও একই ধরনের বক্তব্য দেন এবং জানান, তাঁদের তদন্ত শেষ হলে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হবে।
টাস্কফোর্সের সঙ্গে আলোচনায় চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা প্রাথমিকভাবে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জিয়াউল আহসান ও রোকেয়া প্রাচীর সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়ার কথা জানান এবং বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন। গত ১৩ অক্টোবর প্রসিকিউশনের কাছে থাকা ডিজিটাল আলামত ও তথ্য-উপাত্ত হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়ে চিঠি পাঠায় টাস্কফোর্স। তবে প্রতিবেদন দাখিলের সময় পর্যন্ত পিবিআই কোনো তথ্য পায়নি। প্রতিবেদনে রোকেয়া প্রাচী বা জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে কোনো অপরাধে জড়িত থাকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা বলা হয়নি।
রোকেয়া প্রাচীর নাম আসার বিষয়টির বাইরে দীর্ঘ তদন্তেও হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য এবং কারা এতে জড়িত, তা সুনির্দিষ্ট করা যায়নি বলে জানিয়েছে টাস্কফোর্স। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনাস্থলে পাওয়া ডিএনএ নমুনার মধ্যে দুই অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইল শনাক্ত করা গেলেও তাঁদের পরিচয় জানা যায়নি। সাগরকে বাঁধতে ব্যবহৃত চাদর ও রুনির টি-শার্ট থেকে সংগৃহীত নমুনা পরীক্ষায় ওই দুই অজ্ঞাত পুরুষের ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া যায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ঘটনাস্থলে মোট চারজনের ডিএনএ পাওয়া গেছে—তিনজন পুরুষ ও একজন নারী। তাঁদের মধ্যে একজন পুরুষকে ভুক্তভোগী গোলাম সারওয়ার সাগর এবং নারীকে মেহেরুন নাহার রুনি হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। পরিচয় শনাক্তের চেষ্টায় নমুনা যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ল্যাবে পাঠানো হলেও ডিএনএর মধ্যে একাধিক ব্যক্তির নমুনা মিশে থাকায় সেখান থেকে ছবি প্রস্তুত করা সম্ভব হয়নি। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি, বটি, ছুরির হাতল ও পোশাকসহ অন্যান্য আলামত এবং ২৫ জনের মুখের ভেতরের কোষ থেকে সংগৃহীত নমুনা যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ও নেদারল্যান্ডসের একটি ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল; ল্যাবগুলোর প্রতিবেদনে আলামতের ডিএনএর সঙ্গে পাঠানো ব্যক্তিদের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
অগ্রগতি প্রতিবেদন অনুযায়ী, পূর্ববর্তী তদন্ত কর্মকর্তারা মোট ১৬৭ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়েছিলেন। বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা ৯০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ২৪ জনের জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেছেন। এ ছাড়া মামলার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা ৪৭টি আলামত জব্দ করা হয়েছিল। পূর্ববর্তী তদন্তকারীরা শেরেবাংলা নগর, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি ও কলাবাগান থানায় দায়ের করা ১৩০টি চুরি ও ডাকাতির মামলায় গ্রেপ্তার ১৫ জন সন্দেহভাজনের বিষয়ে তদন্ত করেছিলেন; বর্তমান তদন্তকালে ৪২ জন সন্দেহভাজনের নাম-ঠিকানা ও পিসিপিআর যাচাই করা হয়েছে।
ফরেনসিক পর্যবেক্ষণে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাগর ও রুনির শরীরে অনেক ক্ষত ছিল, যেগুলোর কারণে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় এবং আহত হওয়ার পরও তাঁরা কিছু সময় জীবিত ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয়। তাঁদের ঘাড়, পিঠ ও চোখের নিচে আঘাতের চিহ্ন ছিল। ক্রাইমসিন ও ক্ষতের ধরন বিবেচনায় প্রতিবেদনে বলা হয়, খুনিরা তাড়াহুড়া করেনি; একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের ধরন পেশাদার খুনিদের অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পারিবারিক বা দাম্পত্য কলহে একজনকে হত্যার পর অপরজনের আত্মহত্যার কোনো প্রমাণ প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া যায়নি; বৈজ্ঞানিক পরীক্ষায় দুজনকেই হত্যা করা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। পেশাগত কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি। সাগরের কর্মস্থল মাছরাঙা টেলিভিশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করেও তাঁর পেশাগত জীবনে শত্রুতা বা বিরোধের তথ্য মেলেনি। সাগর ও রুনি দীর্ঘদিন জার্মানিতে ছিলেন এবং মৃত্যুর প্রায় সাত মাস আগে দেশে ফিরেছিলেন। সামিট বিবিয়ানা পাওয়ার প্ল্যান্টের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে; প্ল্যান্টটির নির্মাণকাজ ২০১৩ সালে শুরু হয় এবং কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৫ সালে। অর্থ বা জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, এমন তথ্যও তদন্তে মেলেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাগর-রুনি হত্যা মামলায় চুরি যাওয়া মোবাইল ফোন ও দুটি ল্যাপটপ এখনো উদ্ধার করা যায়নি। পিবিআই, সিআইডি, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স ও র্যাবের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স এসব মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট হিসেবে সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, সাবেক ডিএমপি ডিবি প্রধান মনিরুল ইসলাম, সাবেক র্যাব মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাংবাদিক রুমী নোমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে এবং অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
ভিসেরা পরীক্ষা প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম দফায় সাগর ও রুনির ভিসেরা সংরক্ষণ করা হয়নি। পরে আদালতের অনুমতি নিয়ে কবর থেকে লাশ তুলে পুনরায় ভিসেরা সংগ্রহ করা হয়। ফুসফুস, যকৃৎ ও পাকস্থলীর নমুনা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পাঠিয়ে পরীক্ষায় চেতনানাশক পদার্থের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনের মন্তব্য অংশে টাস্কফোর্স বলেছে, দীর্ঘ তদন্তেও হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদ্ঘাটন, জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং লুণ্ঠিত মালামাল উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত যাচাই, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সাক্ষীদের আরও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও সময় চাওয়া হয়েছে।



