নিউইয়র্কে যৌন পাচার মামলায় আলেক্সান্ডার ভাইদের প্রত্যেকের ৩০ বছরের কারাদণ্ড

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যৌন পাচারের মামলায় তিন ভাইয়ের প্রত্যেককে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। দণ্ডিতরা হলেন তাল আলেক্সান্ডার (৪০) এবং যমজ ভাই ওরেন ও অ্যালন আলেক্সান্ডার (৩৯)। তাঁদের মধ্যে দুজন ধনী রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
মঙ্গলবার নিউইয়র্কের আদালতে এই সাজা ঘোষণা করা হয়। গত মার্চে তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল; অভিযোগ ছিল, তাঁরা নিজেদের সম্পদ ও সামাজিক মর্যাদা ব্যবহার করে নারীদের পার্টি ও বিলাসবহুল বাড়িতে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যেতেন এবং সেখানে তাঁদের যৌন নির্যাতন করতেন।
সাজা ঘোষণার আগে বিচারক ভ্যালেরি ক্যাপরোনি বলেন, ‘আপনাদের আচরণ ছিল জঘন্য।’ তিনি বলেন, ‘আপনাদের অপরাধ তাঁদের জীবনে ধ্বংস ডেকে এনেছে।’
মঙ্গলবার সকালে আদালতে ১২ জন ভুক্তভোগী বক্তব্য দেন, যাঁদের মধ্যে একজন বিচারের সময় সাক্ষ্য দেননি। তাঁরা একে একে তাঁদের মানসিক যন্ত্রণার কথা বলেন এবং যে লজ্জা তাঁরা অনুভব করেছেন, তা যেন অভিযুক্তদের ওপর বর্তায়—সে ইচ্ছার কথা জানান।
ভুক্তভোগীদের অনেকে বিচারকের কাছে প্রত্যেক ভাইয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাজা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চান। মায়া মিলার আদালতকে বলেন, ২০১৪ সালে তাল আলেক্সান্ডার তাঁকে ধর্ষণ করার পর তিনি নিরাপত্তার সব অনুভূতি হারিয়ে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘এটা কখনো না ঘটলে আমি যে মানুষটি হতে পারতাম, তাঁর জন্য আমি নিজের ভেতরে একটি নীরব শোক বয়ে বেড়াই।’
ছদ্মনাম ‘ইসা ব্রুকস’ ব্যবহার করা আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ১৬ বছর বয়সে তাল ও অ্যালন আলেক্সান্ডার তাঁকে ধর্ষণ করার পর তিনি নিজের ওপর আস্থা রাখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগে আমি বুঝতেই পারিনি আমি কতটা বিপদে আছি।’
আরেক নারী বলেন, তিনি ধর্ষণের কথা প্রকাশ্যে আনার পরিকল্পনা করলে তাল আলেক্সান্ডার তাঁকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, তিনি জানেন তাঁর বোন কোথায় কাজ করেন।
প্রসিকিউটর এলিজাবেথ এসপিনোসা বলেন, ভাইয়েরা সর্বোচ্চ সাজারই যোগ্য এবং তথ্যপ্রমাণ ‘সত্যিই বিধ্বংসী একটি চিত্র’ তুলে ধরে। তিনি বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে তাঁরা বিলাসিতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নারীদের প্রলুব্ধ করার কৌশল নিখুঁত করেছেন’ এবং তাঁদের পেছনে ফেলে যাওয়া যন্ত্রণার পথ দেখে তাঁরা ‘সম্পূর্ণ নির্বিকার’ ছিলেন।
অন্যদিকে ভাইদের আইনজীবীরা ১৫ বছরের সাজার জন্য আবেদন করেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, অভিযুক্তরা নিবেদিতপ্রাণ পিতা হয়েছেন এবং তাঁদের অনুপস্থিতিতে পরিবারগুলো ভোগান্তিতে পড়বে। শুনানিতে তিন ভাই আদালতে বক্তব্য দিয়ে নিজেদের নির্দোষ বলে দাবি অব্যাহত রাখেন।
তাল আলেক্সান্ডার বলেন, তাঁদের মানসিকতা ছিল ‘কঠোর পরিশ্রম, কঠোর আনন্দ’ ধরনের এবং তিনি দেখেছেন তাঁর আচরণ ‘মানুষের অনুভূতিতে আঘাত করেছে’। তবে বিচারক ক্যাপরোনি তাঁদের বক্তব্যে সন্তুষ্ট হননি; অপরাধ স্বীকার না করায় তিনি তাঁদের তিরস্কার করে প্রশ্ন তোলেন, যে ব্যক্তি নিজের অন্যায় কখনো স্বীকার করেনি, সে সংশোধিত হবে কীভাবে।
শুনানির শেষে বিচারক নির্দিষ্ট অপরাধের জন্য প্রত্যেককে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেন। অতিরিক্ত অপরাধের জন্য প্রত্যেককে আরও ২০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও সেই সাজা একই সঙ্গে কার্যকর হবে বলে তিনি জানান।
পাঁচ সপ্তাহের বিচারে ১১ জন নারী সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, যাঁদের কয়েকজন বলেছেন নির্যাতনের সময় তাঁরা অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, ভাইয়েরা তাঁদের উপহার দিতেন, অ্যাসপেন ও বাহামাসহ বিভিন্ন জায়গায় বিমানে নিয়ে যেতেন এবং মাদক খাইয়ে ধর্ষণ করতেন।
প্রসিকিউটররা বলেন, ভাইদের এই নির্যাতনমূলক আচরণের ধরন স্কুলজীবন থেকেই শুরু হয়েছিল, যদিও বিচারে ২০০৮ সাল থেকে সংঘটিত অপরাধগুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়। তাঁদের অভিযোগ, তিন ভাই নারীদের পানীয়তে মাদক মেশাতেন, ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের সময় ভুক্তভোগীদের শারীরিকভাবে আটকে রাখতেন এবং চিৎকার ও থামতে বলার স্পষ্ট অনুরোধ উপেক্ষা করতেন।
ভাইদের আইনজীবীদের যুক্তি ছিল, যৌন সম্পর্কগুলো সম্মতিতে হয়েছিল এবং তাঁরা নারীসঙ্গপ্রিয় ছিলেন, নির্যাতনকারী নন।
তাল ও ওরেন নিউইয়র্ক ও মিয়ামিতে বিলাসবহুল সম্পত্তি বিক্রি করে ধনী হন। তাঁরা মার্কিন রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠান ডগলাস এলিম্যানে কাজ করেছেন; তাঁদের গ্রাহকদের মধ্যে লিন্ডসে লোহান, কিম কার্দাশিয়ান ও কানিয়ে ওয়েস্ট ছিলেন। ২০২২ সালে তাঁরা নিউইয়র্কভিত্তিক নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘অফিশিয়াল’ প্রতিষ্ঠা করেন। অ্যালন কাজ করতেন পরিবারের বেসরকারি নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান কেন্ট সিকিউরিটিতে।




