গাজায় নারী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের উৎসব: ধ্বংসস্তূপের মাঝে যাত্রা শুরু করল গাজা সিনেমা একাডেমি
গাজা উপত্যকার আল-বুরেইজে সোমবার শুরু হয়েছে দ্বিতীয় গাজা আন্তর্জাতিক নারী চলচ্চিত্র উৎসব। এই আয়োজনের মধ্য দিয়েই গাজা সিনেমা একাডেমির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে।
উৎসব বসেছে আল-বুরেইজের আল-নাখিল হলের ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানে, ‘মৃত্যু থেকে জীবন সৃষ্টি করছেন নারীরা’ স্লোগানে। ইসরায়েলের তিন বছরের যুদ্ধে গাজার অধিকাংশ ভবনের মতো এই হলটিও ধ্বংস হয়ে গেছে; যুদ্ধে ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
উদ্বোধনীতে দেখানো হয়েছে ফিলিস্তিনি নারীদের তৈরি পাঁচটি প্রামাণ্যচিত্র। এর একটি উদীয়মান নির্মাতা মোনা আবু কাসের ১১ মিনিটের ‘আ স্যাক অব ফ্লাওয়ার’ (এক বস্তা আটা), যা তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে গাজায় ক্ষুধা ও খাদ্য সংকটের গল্প বলে।
ছবিটিতে সাহায্য বিতরণের জায়গাগুলোর বিপদ, আটা জোগাড় করতে গিয়ে প্রাণ হারানোর ঘটনা এবং খাবার ফিরে আসার পরও পরিবারগুলোর ওপর ক্ষুধার মানসিক আঘাত রয়ে যাওয়ার দিকটি এসেছে।
আবু কাস বলেন, ছবির ভাবনা এসেছে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও সত্য ঘটনা থেকে; এটি বোমাবর্ষণ, ধ্বংস, অবরোধ, ক্ষুধা ও হারানোর ভার নিয়ে গাজার দৈনন্দিন জীবনকে ধরে রাখে। তিনি বাস্তবতাকে মানুষ যেভাবে বাঁচে, সেভাবেই দেখাতে চান।
আরেকটি ছবি রাঘদা আল-বুহাইসির ‘বিয়ন্ড সাইলেন্স’, যেখানে এক বধির শিল্পীর গল্প এসেছে, যিনি পড়তে, লিখতে বা ইশারা ভাষায় যোগাযোগ করতে শেখেননি। রাফায় তাঁর স্টুডিও ধ্বংস হয়েছে এবং তাঁর বাবা-মাসহ পরিবারের কয়েকজন নিহত হয়েছেন।
বাস্তুচ্যুত হয়ে মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহে যাওয়ার পর আরেকটি পরিবার তাঁকে আশ্রয় দেয় এবং সড়কের পাশে একটি ছোট স্টুডিও গড়ে দেয়। তাঁর ছবিতে হারানো ও বাস্তুচ্যুতির ছাপ ফুটে ওঠে।
আল-বুহাইসি বলেন, যুদ্ধে প্রতিবন্ধী মানুষদের অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ—বাস্তুচ্যুতি, পরিবার হারানো ও জীবিকা ধ্বংস—তিনি তুলে ধরতে চান। তাঁর মতে, শিল্প ভাষা ও নীরবতার বাধা পেরিয়ে ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে গাজার দুর্ভোগের দৃশ্যমান বার্তায় রূপ দিতে পারে।
বাকি তিনটি ছবি হলো ‘সোসো: দ্য লাইফলাইন’, ‘রেমন্যান্টস অব লাইট’ ও ‘দানদানা’। প্রথমটি এক এতিম শিশু ও তার গাধার গল্প, যারা মানুষকে বাঁচতে সাহায্য করে; দ্বিতীয়টিতে পরিবার ও বাড়ি হারানো এক নির্মাতার সংগ্রাম; তৃতীয়টিতে আট সন্তান হারানো এক মায়ের গল্প, যিনি বেঁচে থাকা পরিবার নিয়ে ফিলিস্তিনি গানে শোক সামলান।
পাঁচটি প্রামাণ্যচিত্রই তৈরি হয়েছে মার্চে শুরু হওয়া একটি চলচ্চিত্র ডিপ্লোমা কর্মসূচি থেকে, যেখানে ২৫ জন তরুণ ফিলিস্তিনি নারী অংশ নিয়েছিলেন।
উৎসব পরিচালক এজ্জেদিন শাল্লাহ বলেন, ছবিগুলো যুদ্ধে নারী ও কিশোরীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এসেছে, দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্য-সাক্ষ্য দিয়েছে এবং নারীদের নিজের কণ্ঠে নিজের গল্প বলার জায়গা দিয়েছে। তাঁর মতে, ছবিগুলো ব্যক্তিগত যন্ত্রণাকে বৃহত্তর মানবিক গল্পে রূপ দিয়ে যুদ্ধের মানসিক ও সামাজিক ক্ষত দেখায়।
৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলা এই উৎসবে ২৪টি দেশের ৭৩টি ছবি দেখানো হচ্ছে।
তবে গাজায় চলচ্চিত্র নির্মাণের বাধা বড়: সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস, সরঞ্জামের ঘাটতি, অর্থের অভাব, বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট বিভ্রাট এবং যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির চাপ। নারী নির্মাতাদের প্রশিক্ষণ, প্রযোজনা ও আন্তর্জাতিক উৎসবে পৌঁছানোও কঠিন।
উৎসবের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিমা মাহমুদ বলেন, যুদ্ধ ও ২০২৩ সালের আগের ইসরায়েলি অবরোধ তরুণ নারীদের চলচ্চিত্র নির্মাণকে বাধাগ্রস্ত করেছে; কেউ কেউ সহজ পদ্ধতি ও নিজের অর্থে গাজার বাস্তবতা ধরে রেখেছেন। তাঁর ভাষায়, সীমিত সম্পদ সত্ত্বেও এই ছবিগুলোর আন্তর্জাতিক পরিচিতি পাওয়া উচিত।
লেবাননভিত্তিক ফিলিস্তিনি নির্মাতা ও আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা মাই মাসরি বলেন, ছবিগুলো তরুণ নারীদের নিজের গল্প বলতে, মুছে ফেলার চেষ্টা প্রতিরোধ করতে ও যৌথ স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করে। একাডেমি আল-কুদস ওপেন ইউনিভার্সিটির সঙ্গে চলচ্চিত্র ডিপ্লোমা গড়েছে, যা ফিলিস্তিনের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃত, এবং নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক উৎসবে পৌঁছে দিতে পরিবেশকদের সঙ্গে চুক্তির চেষ্টা চলছে।


