ইসরায়েলের নির্বাচনে বুথফেরত জরিপে হাড্ডাহাড্ডি: দুই জোটই ৫১ আসনে, আরব দলগুলোর ঝুলিতে ১৮
ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোট শেষে বুথফেরত জরিপে কোনো স্পষ্ট বিজয়ী মেলেনি। হালনাগাদ বুথফেরত হিসাবে ১২০ আসনের নেসেটে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ-নেতৃত্বাধীন জোট এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার দলের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট দুটোই ৫১টি করে আসন পেতে যাচ্ছে।
কোনো জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের ধারেকাছে নেই। বুথফেরত হিসাবে কোনো জোটে না থাকা আরব দলগুলো পেতে যাচ্ছে ১৮টি আসন, ফলে দুই প্রধান শিবিরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে ১০ আসন দূরে থাকছে।
বুথফেরত তথ্য অনুযায়ী, আরব-নেতৃত্বাধীন প্রধান দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম নেসেটে রেকর্ড সংখ্যক আসন ধরে রাখতে যাচ্ছে। ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভোটদানের হার প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে, যা কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং ১৯৯৯ সালের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে বলে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ মঙ্গলবার জানিয়েছে।
সার্বিক ভোটদানও ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবারের নির্বাচনে ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ ভোট পড়েছে, যা ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ। ইসরায়েলের ১ কোটি জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিক, যারা ঐতিহাসিকভাবে ইহুদি ইসরায়েলিদের তুলনায় কম হারে ভোট দিয়ে এসেছেন।
রা’আম বা ইউনাইটেড আরব লিস্টের নেতা মানসুর আব্বাস চ্যানেল ১২-কে বলেন, ‘এখনকার সংখ্যা দিয়ে কোনো সরকার হয় না।’ তিনি আশা প্রকাশ করেন, চূড়ান্ত ফলাফলে তার দলসহ নেতানিয়াহুবিরোধী জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসন পাবে। বর্তমানে নেসেটে পাঁচটি আসন থাকা রা’আম ২০২১ থেকে ২০২২ সালে ইসরায়েল শাসন করা জোট সরকারেও ছিল। আব্বাস জানান, নির্বাচনের আগে ও পরে দুই প্রধান জোটই তার দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
বিরোধী নেতারা সংখ্যা কমলেও ফলাফলকে সরকারের পরাজয় হিসেবেই দেখছেন। ইয়াশার দলের প্রধান আইজেনকোট ভোট শেষে সমর্থকদের বলেন, প্রাথমিক হিসাবে ‘নেতানিয়াহু ও ৭ অক্টোবরের সরকারের প্রতি সম্পূর্ণ অনাস্থা’ প্রকাশ পেয়েছে বলে এএফপি জানিয়েছে। বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ এক বিবৃতিতে বলেন, ‘কেউ যেন আপনাদের বিভ্রান্ত না করে: নেতানিয়াহু জোট চরম পরাজয়ের শিকার হয়েছে। এটি সম্পূর্ণ ধস, জনগণ তাদের বাড়ি চলে যেতে বলেছে।’
নেতানিয়াহু শিবিরের জ্যেষ্ঠ নেতারা বিরোধীদের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও নেতানিয়াহুর প্রধান মিত্র গিদেয়ন সার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধীদের বক্তব্যকে ‘অকাল’ বলে মন্তব্য করেন এবং লেখেন, লিকুদই পার্লামেন্টে সবচেয়ে বড় একক দল রয়ে গেছে। তেল আবিবে আইজেনকোটের অনুষ্ঠানে সমর্থকেরা জরিপের ফলাফলে উল্লাস করলেও নেতানিয়াহুপন্থীরা বলছেন, চূড়ান্ত ফলাফলে ভারসাম্য বদলে যেতে পারে।
ভোটের দিনের শেষ মুহূর্তে নেতানিয়াহু ও তার উগ্র-ডান জোট সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে টানতে জোর প্রচেষ্টা চালান এবং ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে ভোটদান বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে সতর্ক করেন, যে কৌশলকে আরব রাজনীতিকেরা বর্ণবাদী ও উসকানিমূলক বলে নিন্দা করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, লিকুদের পতাকা লাগানো গাড়ি জেরুজালেমে ইসলামি আযানের শব্দ বাজিয়ে ঘুরেছে এবং সমর্থকদের বলা হয়েছে, ‘আরবরা ভোট দিচ্ছে’ বলে তারা যেন ভোট দেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতানিয়াহু আরব সম্প্রদায়ের ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ সারির কথা তুলে ধরেন এবং লেখেন, ‘এখনই না জাগলে মানসুর আব্বাস ও আহমাদ তিবির সরকার পেয়ে যাব।’
আরব রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা আসন্ন জোট আলোচনায় নিজেদের সম্ভাব্য ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। মানসুর আব্বাস সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা পাওয়া এই ম্যান্ডেটকে দেশে নতুন বাস্তবতায় রূপ দেব।’ নাজারেথে জয়েন্ট লিস্ট জোটের সদর দপ্তরে প্রার্থী ফাতেন গাত্তাস সমর্থকদের বলেন, ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের উচ্চ অংশগ্রহণের লক্ষ্য ছিল নেতানিয়াহুর জাতীয়তাবাদী জোটের ফেরত আসা ঠেকানো। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী তিনি বলেন, ‘আমরা দখলদারিত্ব ও বর্ণবাদ প্রত্যাখ্যান করি, আমরা এখানেই থাকব।’
সাবেক ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত আলোন পিনকাস আল জাজিরাকে বলেন, আইজেনকোটের মতো দলগুলোর জন্য সরকার গড়া কঠিন হতে পারে, কারণ প্রচারের সময় তারা আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তিনি বলেন, এর মূল্য দিতে হবে, কারণ ‘আরবদের বাইরে রেখে শুধু ভোটের প্রয়োজন হলেই তাদের কাজে লাগানো যায় না’। তিনি আরও বলেন, আরব-নেতৃত্বাধীন তালিকাগুলো এমন দাবি তুলবে, যা ইহুদি-নেতৃত্বাধীন জোট সরকার সমর্থন নাও করতে পারে।
আল জাজিরার নূর ওদেহ অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে জানান, এই নির্বাচন ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলিদের জন্য ‘অস্তিত্বের মুহূর্ত’। তিনি বলেন, রেকর্ড ভোটদান এসেছে এমন ভোটারদের কাছ থেকেও, যারা সাধারণত নির্বাচন বয়কট করতেন এবং বিশ্বাস করতেন না এতে কোনো প্রভাব পড়বে বা তাদের বাস্তবতা বদলাবে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, নেসেট ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক ১০০-র বেশি আইন পাস করেছে এবং রাষ্ট্রীয় তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রেও তারা বৈষম্যের শিকার।
কোনো শিবিরই সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পৌঁছাতে না পারায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আগামী দিনগুলোতে আনুষ্ঠানিক জোট আলোচনা শুরু হলে ছোট দলগুলোই মূল নির্ণায়ক হয়ে উঠবে।




