কর্ণাটকের রামানালে আখ কাটার কাজে জরায়ু হারাচ্ছেন মহারাষ্ট্রের বীডের নারী শ্রমিকেরা

ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের প্রত্যন্ত এলাকা রামানাল। ভোররাত চারটায় সেখানকার অস্থায়ী তাঁবুতে থাকা নারীরা পুরুষদের ঘুম থেকে ওঠার আগেই স্নান সেরে নেন। তাঁদের একজন পূর্ণিমা; নিজের গ্রাম থেকে ৫০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে তিনি এখানে আখ কাটার কাজ করতে এসেছেন।
পূর্ণিমার মতো আনুমানিক ১৫ লাখ নারী ও পুরুষ আখ কাটার কাজে যুক্ত। তাঁদের অনেকে দিনে প্রায় ১৪ ঘণ্টা কাজ করেন এবং দৈনিক মজুরি পান মাত্র ৪০০ রুপি। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত আখ কাটার পর তা ট্রাকে তোলার কাজও তাঁদের করতে হয়।
বিশ্বের মোট আখ উৎপাদনের প্রায় ১৬ শতাংশ আসে ভারত থেকে এবং কোকা-কোলা ও পেপসিকোর মতো কোম্পানির কোমল পানীয় তৈরিতে এই অঞ্চলের আখ ব্যবহৃত হয়। এই শ্রমিকদের বড় অংশই মহারাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলের বীড জেলার বাসিন্দা; নিজেদের এলাকায় কাজের সুযোগ কম থাকায় পরিবার চালাতে তাঁরা এই কঠিন কাজ করেন।
কাজ ধরে রাখতে গিয়ে অনেক নারী প্রজনন স্বাস্থ্যের বড় ঝুঁকি নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ঋতুস্রাবের সময় ছুটি নেওয়ার সুযোগ না থাকায় অনেক নারী জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচারকে সমস্যার সমাধান হিসেবে বিবেচনা করছেন। শ্রমিকদের অস্থায়ী শিবিরে পর্যাপ্ত শৌচাগার ও বিশুদ্ধ পানি নেই এবং একদিন কাজে অনুপস্থিত থাকলেই মজুরি থেকে বড় অঙ্কের অর্থ কেটে নেওয়া হয়।
বীডের বহু পরিবারের জীবিকার একমাত্র উৎস এই মৌসুমি কাজ। প্রতিবছর ‘মুক্কাদাম’ নামে পরিচিত ঠিকাদারেরা শ্রমিকদের সংগঠিত করেন; তাঁরা চিনিকলের সঙ্গে যোগাযোগ, শ্রমিকদের যাতায়াতের ব্যবস্থা এবং আগাম অর্থ দেন। স্বামী-স্ত্রী মিলে একটি দলকে স্থানীয় ভাষায় ‘কোইটা’ বলা হয়। আগাম অর্থ শোধ করতে প্রতি দম্পতিকে দিনে গড়ে তিন টন আখ কাটতে হয়। সাত-আটটি কোইটার উৎপাদন ও আয় একসঙ্গে হিসাব করা হয়, ফলে একটি দল কাজ করতে না পারলে অন্যদের ওপর চাপ পড়ে এবং কোনো নারী কাজে যেতে না পারলে অন্য জুটিগুলো তাঁর কাছ থেকে জরিমানা আদায় করে।
অধিকারকর্মী সংগীতা চাভান দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। ২০১৯ সালে শিবসেনা (একনাথ শিন্ডে) দলের নেত্রী ডা. নীলম গোর্হের একটি প্রতিবেদনে মহারাষ্ট্রে জরায়ু অপসারণের উচ্চহার উঠে আসার পর বিষয়টি জোরেশোরে আলোচনায় আসে। সংগীতার অভিযোগ, কম খরচে চিকিৎসার জন্য নারীদের সরকারি হাসপাতালে পাঠানোর পরিবর্তে কখনো কখনো এমন চিকিৎসাকেন্দ্রে যাওয়ার চাপ দেওয়া হয়, যেখানে যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়াই অস্ত্রোপচার করা হয়।
ভারতে প্রত্যন্ত নারীদের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত করতে ‘আশা’ কর্মীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করেন। সংগীতা জানান, জরায়ু অপসারণের জন্য রোগী পাঠানোর বিনিময়ে কেউ কেউ অর্থ পেয়ে থাকেন বলে তিনি জানতে পেরেছেন; তবে মহারাষ্ট্রের আশা কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। বীডের ওয়াদওয়ানি এলাকার আশা কর্মী গঙ্গা শেভান্তে বলেন, অল্প বয়সে নারীদের জরায়ু অপসারণের কথা তিনি শুনেছেন, তবে সেগুলো সরকারি না বেসরকারি হাসপাতালে হয়েছে তা তিনি নিশ্চিত নন এবং রোগী পাঠানোর জন্য তিনি নিজে কখনো অর্থ নেননি।
অস্ত্রোপচারের পরও অনেক নারীর কষ্ট কমেনি। সবিতা নামের একজন কর্মী জরায়ু অপসারণের কয়েক মাস পরও রক্তপাত ও ব্যথায় ভুগছেন। পুনেতে গিয়ে তিনি জানতে পারেন তাঁর সংক্রমণ হয়েছে এবং অস্ত্রোপচারের প্রতিবেদন চাইলে তাঁকে তা দেওয়া হয়নি বলে তিনি অভিযোগ করেন।
আখের ঠিকাদারেরা বলেন, তাঁরা কোনো নারীকে অস্ত্রোপচার করাতে বাধ্য করেন না; তবে কাজ থেকে ছুটি নিলে মজুরি দেওয়া হয় না, কারণ শ্রমিক কম থাকলে ট্রাকে আখ তোলার পরিমাণ কমে যায় এবং পরের মৌসুমে চিনিকলগুলো তাঁদের কাজ দিতে নাও চাইতে পারে।
২০১৯ সালে মহারাষ্ট্র সরকার বীড থেকে আখ কাটতে যাওয়া ৮২ হাজার ৩০৯ জন নারীকে নিয়ে জরিপ করেছিল। তাতে দেখা যায়, তাঁদের মধ্যে ১৩ হাজার ৮৬১ জনের জরায়ু অপসারণ করা হয়েছে এবং তাঁদের মধ্যে ৪৫ শতাংশের বেশি নারী পরে শারীরিক ও মানসিক সমস্যার কথা জানিয়েছেন। এরপর সরকার ঘটনা তদন্ত এবং অভিবাসী শ্রমিকদের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়। ২০২৫ সালের মার্চে বোম্বে হাইকোর্ট আখশ্রমিকদের নিবন্ধন, কল্যাণ ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর নির্দেশ দেন; তবে পরবর্তী প্রতিবেদন ২০২৫ সালের নভেম্বরে দেওয়ার কথা থাকলেও তা প্রকাশিত হয়নি এবং মাঠপর্যায়ের শ্রমিকদের দাবি, বাস্তবে পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি।
তিন বছর ধরে ঋতুস্রাবের ব্যথায় ভুগছেন পূর্ণিমা। ব্যথা কমানোর ওষুধ কিনতেই বছরে প্রায় ৫০ হাজার রুপি খরচ হয় তাঁর। গ্রামে ফিরে এবার তাঁকে অস্ত্রোপচার করাতে হবে এবং এর জন্য আবার ঋণ করতে হবে। বীড জেলার প্রশাসন ও জনকল্যাণের দায়িত্বে থাকা জেলা কালেক্টর বিবেক জনসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কোকা-কোলা জানিয়েছে, তারা আন্তর্জাতিক সংগঠন সলিডারিডাড নেটওয়ার্কের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে শ্রমিকদের বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, ছায়াযুক্ত বিশ্রামস্থল, শারীরিক শ্রম কমানোর সরঞ্জাম ও নারীদের স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত পণ্যের সুযোগ বাড়াতে কাজ করছে। পেপসিকোর কাছে মন্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটি কোনো জবাব দেয়নি।




