পাচারের শিকার হয়ে দৌলতদিয়ায়, সেখান থেকেই মানবাধিকারের লড়াইয়ে ফরিদা পারভীন

মাত্র ১২-১৩ বছর বয়সে পাচারকারীদের খপ্পরে পড়েছিলেন ফরিদা পারভীন। যে বয়সে বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা, ঠিক সেই বয়সেই তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়েছিল রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া যৌনপল্লির অন্ধকারে। শৈশব হারানোর সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ভাগ্যকে মেনে নিয়ে সেখানে হার মানেননি ফরিদা। নিজের জীবনের ওই মর্মান্তিক অভিজ্ঞতাকেই পরে তিনি শক্তিতে রূপান্তর করেন। অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার সেই জেদই তাঁকে পরিণত করেছে মানবাধিকারের লড়াইয়ের একজন কর্মীতে।
ফরিদার জীবনের মোড় ঘুরতে শুরু করে ২০০১ সালে। ওই বছর 'পায়াক্ট বাংলাদেশ' নামের একটি সামাজিক সংগঠনে পিয়ার এডুকেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। যৌনপল্লির নারীদের স্বাস্থ্যসেবা, সচেতনতা বৃদ্ধি ও অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, তাঁর মতো আরও কতশত নারী প্রতিদিন নিঃশব্দে যন্ত্রণা পোহাচ্ছেন।
সেই তাগিদ থেকেই অন্য ১০ জনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি গড়ে তোলেন 'অবহেলিত মহিলা ও শিশু উন্নয়ন সংস্থা'। বর্তমানে এই সংগঠনের সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করে তিনি দৌলতদিয়া যৌনপল্লির অবহেলিত নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন।
ফরিদার এই লড়াই কেবল নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাঁর পরামর্শ ও সাহচর্যে দৌলতদিয়া যৌনপল্লির অন্ধকার ছেড়ে নতুন জীবন শুরু করেছেন প্রায় অর্ধশত নারী। তাঁদের কেউ বেছে নিয়েছেন স্বাভাবিক সংসারজীবন, কেউ আবার যুক্ত হয়েছেন মানবাধিকার ও সেবামূলক কাজে।
জেলী আক্তার কিংবা দেবীর মতো নারীরা আজ সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আত্মবিশ্বাসী জীবন কাটাচ্ছেন। বর্তমানে ফরিদার গড়া সংগঠনের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে বিভিন্ন এনজিও ও মানবাধিকার সংস্থায় কাজ করছেন প্রায় ৩০ জন নারী-পুরুষ।
দৌলতদিয়ার নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো, সচেতনতা তৈরি এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়েও কাজ করছেন ফরিদা। শিশুরা তাদের জন্মপরিচয় বা পারিবারিক বাস্তবতার কারণে যেন শিক্ষা ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সে লড়াইও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
প্রান্তিক এই নারীদের অধিকার ও স্বাস্থ্যসেবার দাবি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে তিনি ইতিমধ্যে চারটি দেশে ১০ বার বিভিন্ন সভা-সেমিনারে অংশ নিয়েছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফরিদার এই পথচলা আজ কেবল একটি স্থানীয় উদ্যোগ নয়; এটি হয়ে উঠেছে অবহেলিত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক প্রতীক।



