নয় মাসে নির্যাতনের শিকার ২ হাজার ১৭১ নারী ও কন্যাশিশু: মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপ-পরিষদের সম্প্রতি প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত নয় মাসে দেশে মোট ২ হাজার ১৭১ জন নারী ও কন্যা বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৮০৮ জন।
ঘরের চার দেয়াল কিংবা শিক্ষালয়ের পথ—প্রতিবেদনের চিত্র বলছে, নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য নিরাপদ জায়গা কমে আসছে। বছরের শুরু থেকে নারী ও কন্যা নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে থাকলেও তা ভয়াবহ রূপ নেয় বছরের মাঝামাঝি সময়ে।
পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে নির্যাতনের শিকার নারীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৮৩ জন করে। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯০ জনে। এরপর এপ্রিলে ২২০ জন এবং মে মাসে তা ২৫৯ জনে গিয়ে ঠেকে।
বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর মাস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে জুন। এই মাসে এককভাবে ৩৩৩ জন নারী ও কন্যা সহিংসতার শিকার হন। জুলাই মাসে সংখ্যাটি কিছুটা কমে ২৯৯ জন হয় এবং আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে তা ২৫২ জনে নামে আসে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মহিলা পরিষদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি নৃশংসতার শিকার হচ্ছে কম বয়সী কন্যাশিশুরা। উদাহরণস্বরূপ, শুধু জুন মাসেই মোট ১০০ জন নারী ধর্ষণের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে ৭২ জনই ছিল কন্যাশিশু। এর মধ্যে ৫২টি সাধারণ ধর্ষণ, ১২টি দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা রয়েছে এবং ৭ জন কন্যাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়।
একইভাবে জুলাই মাসে ৭৫ জন ধর্ষণের শিকার হন, তাঁদের মধ্যে ৪৫ জন কন্যাশিশু।
শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি হত্যার চিত্রও ভয়ের। জুলাই মাসে ৫০ জন (৩৯ নারী ও ১১ কন্যা) এবং সেপ্টেম্বর মাসে ৫২ জন (৩৯ নারী ও ১৩ কন্যা) নারী ও কন্যাকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রতি মাসে রহস্যজনক মৃত্যু এবং আত্মহত্যার প্ররোচনার ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে স্কুল-কলেজপড়ুয়া তরুণী ও শিশুরা সাইবার সহিংসতা এবং উত্ত্যক্তকরণের শিকার হচ্ছে। যেমন জুন মাসেই ২৯ জন উত্ত্যক্তকরণের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে ১৭ জনই কন্যাশিশু।
পাশাপাশি কন্যাশিশুদের বাল্যবিবাহ থেকে রক্ষা করতে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হলেও সেপ্টেম্বর মাসেই একটি বাল্যবিবাহ সম্পন্ন এবং সাতটি বাল্যবিবাহের চেষ্টার ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধীদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাব, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে উঠছে। পাশাপাশি পারিবারিক অসচ্ছলতা এবং সাইবার অপরাধের অবাধ বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘরে কিংবা বাইরে নারীর এই নিরাপত্তাহীনতা শুধু একক কোনো পরিবারের সংকট নয়। আইনের কঠোর প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সর্বস্তরে মানসিকতার পরিবর্তন না আনলে এই সহিংসতা থামানো যাবে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।



