দায়িত্ব ছাড়ার আগে ইউরোপের প্রধান কৌঁসুলির সতর্কবার্তা: কাজ ঠিকমতো করছে বলেই ‘নরমভাবে মেরে ফেলা’ হবে ইপিপিওকে

ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান পাবলিক প্রসিকিউটর লরা কোদ্রুৎসা কোভেসি দায়িত্ব ছাড়ার প্রাক্কালে সতর্ক করে বলেছেন, ইউরোপীয় পাবলিক প্রসিকিউটরস অফিস (ইপিপিও) তার কাজ ঠিকমতো করছে বলেই সংস্থাটিকে ‘নরমভাবে মেরে ফেলা’ হতে পারে। সাত বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বাজেট সংকট ও আমলাতান্ত্রিক জড়তাকে সংস্থাটির ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
লুক্সেমবার্গে নিজের কার্যালয় থেকে ভিডিওকলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোভেসি বলেন, “আমি উদ্বিগ্ন যে ইপিপিও তার কাজ করছে বলেই এটিকে নরমভাবে মেরে ফেলা হবে।” ডেনমার্কের জনপ্রিয় টিভি ধারাবাহিক ‘বোরগেন’-এর একটি বিখ্যাত সংলাপের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ব্রাসেলসে কেউ কারও চিৎকার শুনতে পায় না—এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে কথাটি সত্য।
কোভেসির দাবি, কোনো প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে চাইলে তিনটি পরিচিত কৌশল নেওয়া হয়, আর তিনটিই এখন ইপিপিওর ক্ষেত্রে ঘটছে। প্রথমত, সংস্থাটিকে কম অর্থ দেওয়া হচ্ছে। কাগজে-কলমে ২৩০ জন ইউরোপীয় প্রতিনিধি কৌঁসুলি থাকার কথা থাকলেও অর্থ বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১৮০ জনের জন্য, আর নিরাপত্তা সেবার খরচের মাত্র এক-তৃতীয়াংশের অর্থ পাওয়া যাচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, সব সিদ্ধান্তে দীর্ঘসূত্রতা। কোভেসি জানান, ২০২১ সাল থেকেই তারা বলে আসছেন ইপিপিও বিধিমালা সংশোধনের কাজ আগেভাগে শুরু করতে হবে, কিন্তু তা পিছিয়েই চলেছে। তৃতীয়ত, তার ভাষায়, ব্রাসেলসে সবকিছুই অত্যন্ত জটিল—এমনকি তার নিজের দেশ রোমানিয়ার চেয়েও বেশি।
সদস্য দেশগুলোর সরকারের চাপের উদাহরণও তুলে ধরেন তিনি। পোল্যান্ডে ২৪ জন ইউরোপীয় প্রতিনিধি কৌঁসুলি নিয়োগে সম্মতি মিললেও এখন পর্যন্ত সেখানে কাজ করছেন মাত্র ১৫ জন। হাঙ্গেরির ক্ষেত্রে ইপিপিও ঠিক কত বাজেট দরকার তা জানালেও ইউরোপীয় কমিশন প্রস্তাব করেছে তার অর্ধেক। কোভেসির প্রশ্ন, এভাবে সংস্থাটি কীভাবে বিশ্বাসযোগ্য থাকবে।
গ্রিসে ইউরোপীয় প্রতিনিধি কৌঁসুলিদের মেয়াদ নবায়ন নিয়ে ঘটা ঘটনাকে তিনি ইপিপিওকে ভয় দেখানোর সবচেয়ে স্পষ্ট চেষ্টা বলে বর্ণনা করেন। সাক্ষাৎকারে গ্রিসের কৃষি ভর্তুকি কেলেঙ্কারি এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন নিয়েও তিনি কথা বলেন।
নিজের মেয়াদের মূল্যায়নে কোভেসি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন একটি দক্ষ, শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গড়বেন, যাতে নাগরিকেরা আস্থা রাখতে পারেন। তার মতে, সহকর্মীদের নিয়ে তারা বড় পরিসরে তা অর্জন করতে পেরেছেন, যদিও সবকিছুতে সফল হননি। তিনি বলেন, প্রথম কয়েক বছরের ফলাফল অনেকের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি ছিল এবং আইন সবার জন্য সমান—এ কথা তারা প্রমাণ করতে পেরেছেন।
তবে উত্তরসূরি নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। প্রধান কৌঁসুলি পদের প্রার্থীদের বক্তব্য শুনে তিনি চিন্তিত হয়েছেন জানিয়ে কোভেসি বলেন, একজন প্রার্থী নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যেন তার প্রকল্প হলো ইপিপিওকে ‘স্বাভাবিক’ করা—কমিউনিজমের সময়ে বেড়ে ওঠা কারও কাছে যা খুবই হুমকিস্বরূপ। আরেক প্রার্থী সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সমান দূরত্ব বজায় রাখার কথা বলেছেন, যা স্বাধীন কার্যালয়ের ধারণার সঙ্গে কীভাবে মেলে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
কোভেসির মতে, ইপিপিওর কার্যক্রমে বেশিরভাগ সদস্য দেশে অপরাধ শনাক্তের হার বেড়েছে, সফল মামলার সংখ্যা বেড়েছে এবং ইইউ বাজেটের সুরক্ষাও আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে। তবে সবকিছু যেভাবে চলা উচিত ছিল, সেভাবে চলছে না বলেও তিনি স্বীকার করেন। আবার সুযোগ পেলে ভিন্ন কিছু করতেন কি না—জবাবে তিনি বলেন, কিছুই বদলাতেন না; বদলাতে হবে অন্যদের আচরণ।
শুক্রবার তার সাত বছরের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। কোভেসির ভাষায়, ইপিপিওর সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বিধিমালা সংশোধন প্রক্রিয়া—সেটিই দেখিয়ে দেবে, স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রকৃত বন্ধু আসলে কে।




