কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের ছড়াছড়ি: অন্তত ২০টি দল সক্রিয়, পাঁচ দফা অভিযানে আটক ২ হাজার ৩৫ জন, নেপথ্যের ‘বড় ভাইদের’ নিয়ে প্রশ্ন

কুমিল্লা নগরীর একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফয়সাল হোসেন (ছদ্মনাম)। বাবা-মা দুজনই সরকারি চাকরিজীবী। স্কুল ছুটির পর বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতে গিয়ে পরিচয় হয় নগরীর স্টেশন এলাকার কলেজপড়ুয়া মুনতাসির মুন্নার সঙ্গে। সেই পরিচয়ই ধীরে ধীরে তাকে টেনে নেয় কিশোর গ্যাংয়ের জগতে।
ফয়সালের ভাষ্য, মুন্না তাকে সহযোগিতার পাশাপাশি একটি সুইচগিয়ার ছুরিও উপহার দেন। এর বিনিময়ে মুন্নার সঙ্গে বিভিন্ন মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিত ফয়সাল। মুন্নার মোটরসাইকেল, টিকটকের ভিডিও আর এলাকায় বাইক নিয়ে মহড়া ফয়সালের কাছে হয়ে ওঠে আকর্ষণের কেন্দ্র। স্কুলে প্রতিপক্ষ গ্রুপের সদস্যদের হুমকির মুখে পড়লে পাল্টা প্রতিরোধের প্রস্তুতিও নেয় সে। সম্প্রতি পুলিশের অভিযানে আটক হওয়ার পর ছাড়া পেয়ে কিশোর গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে ফয়সাল।
ফয়সালের মতো কুমিল্লা নগরীর আরও বহু কিশোরের হাতে উঠছে ধারালো অস্ত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে এক দলের বিরুদ্ধে আরেক দলের পাল্টাপাল্টি ভিডিও, হুমকি আর শক্তি প্রদর্শনের প্রতিযোগিতা। কখনো তুচ্ছ বিরোধ, কখনো আধিপত্য বিস্তার, আবার কখনো ব্যক্তিগত ক্ষোভের জেরে সংঘাত গড়াচ্ছে রক্তক্ষয়ী পরিণতিতে। ঝরছে কিশোর-তরুণের প্রাণ, হতাহত হচ্ছেন সাধারণ মানুষও।
কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নতুন নয়। ২০১৫ সালের দিকে নগরীতে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে। তখন সক্রিয় ছিল তিন থেকে চারটি দল। ২০২২ সালের দিকে আলোচিত দলের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ২০টিতে দাঁড়ায়। সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানে নগরীতে অন্তত ২০টি গ্যাং সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও কুমিল্লা জেলা পুলিশের কাছে এসব দলের হালনাগাদ তথ্য নেই।
বড় দলের ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন শাখা ও উপদল। কিং স্কোয়াড, রতন গ্রুপ বা আর স্কোয়াড, ঈগল, সিবিকে ও ক্রাইম সেটআপসহ বিভিন্ন নামে পরিচিত এসব দলের তৎপরতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর অপরাধের বিস্তার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত কুমিল্লায় অন্তত ১২টি হত্যাকাণ্ডে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের নাম এসেছে।
হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন গোমতী নদীর পালপাড়া এলাকার শুভ, নগরীর মোগলটুলীর শিক্ষার্থী আজমাইন আদিল, মডার্ন স্কুলের ছাত্র মুমতাহিন হাসান মিরন, অটোরিকশাচালক শাহজাহান, দিশাবন্দ এলাকার সাজ্জাতুল ইসলাম অনিক, অজিত গুহ কলেজের ছাত্র অন্তু, ব্রিটানিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী শাহজাদা ইসলাম, অশোকতলার সজীব হোসেন বাবু, দক্ষিণ চর্থার ফয়সাল ইসলাম, নগর উদ্যানের সামনে নিহত শাহাদাত হোসেন, ঠাকুরপাড়ার মোহাম্মদ আমিন এবং ইপিজেডের কর্মকর্তা খায়রুল বাশার।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান জোরদার করেছে পুলিশ। ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১৮টি থানায় একযোগে অভিযানে ৭০২ জনকে আটক করা হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ৪৫১ জনকে অভিভাবকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়; বাকি ১৭৩ জনকে বিভিন্ন অভিযোগে আদালতে পাঠানো হয়।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফুর রহমান বলেন, চলমান অভিযানে আটক সবাই কিশোর অপরাধী নয়। যারা অপরাধী, তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে; যারা নির্দোষ, তাদের পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
এরপরও চলে জেলা পুলিশের অভিযান। ৩ অক্টোবর পর্যন্ত পাঁচ দফার অভিযানে মোট ২ হাজার ৩৫ জনকে আটক করার কথা জানায় পুলিশ। একই সময়ে রতন গ্রুপ ও ক্রাইম সেটআপের চার কথিত শীর্ষ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
নগরবাসীর অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে কেউ কেউ কিশোরদের মিছিল-সমাবেশ, প্রতিপক্ষকে ভয় দেখানো কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করেন। গ্রেপ্তারের পর তদবিরের মাধ্যমে ছাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কিশোর গ্যাংয়ের নেতৃত্বে শুধু অপ্রাপ্তবয়স্করা নয়, ১৯ থেকে ৩০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিরাও রয়েছেন বলে বিভিন্ন সময়ে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে।
নগরবিদ ড. আহসানুল কবির বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের মূল হোতাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তারা কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত, সেটি বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদেরও এসব গ্রুপে যুক্ত করা হচ্ছে, যা সমাজের জন্য উদ্বেগজনক। মূল হোতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলে শুধু সদস্যদের আটক করে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সুমি আক্তার বলেন, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে প্রথমেই পরিবারকে সচেতন হতে হবে। সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কী করছে এবং কাদের সঙ্গে মিশছে, সেদিকে অভিভাবকদের নিয়মিত খেয়াল রাখা জরুরি।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান বলেন, প্রতিদিনই কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের আটক করা হচ্ছে। কে বড় ভাই, কে ছোট ভাই—তা বিবেচনায় না নিয়ে অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। গ্যাংয়ের মূল হোতাদের চিহ্নিত করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, প্রয়োজনে তাদের গ্রেপ্তার করা হবে। ২৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক বক্তব্যে পুলিশ সুপার জানিয়েছিলেন, কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানে কেউ চাপ প্রয়োগ বা তদবির করলে তার নাম প্রকাশ করা হবে।
কুমিল্লার জেলা প্রশাসক রোজী আক্তার বলেন, আজকের শিশু-কিশোররা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, তারা থাকবে পড়ার টেবিলে। এ বিষয়ে অভিভাবকদের নিজের সন্তানের প্রতি খেয়াল রাখতে হবে, আর প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সচেতনতা কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।




