ঢাকায় অন্তত ১৫০ সক্রিয় কিশোর গ্যাং, গবেষণায় উঠে এল বিস্তারের আট কারণ

কিশোর গ্যাং সংস্কৃতির বিস্তার, এর নেপথ্যের কারণ ও উত্তরণের উপায় নিয়ে গবেষণা করেছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম আনোয়ার হোসেন। তিনি বর্তমানে সেনাসদরের ইঞ্জিনিয়ার পরিদপ্তরের পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার্স) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
কিশোর গ্যাং নিয়ে তাঁর গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের (এনডিসি) জার্নালে। এতে কিশোরদের গ্যাংয়ে জড়িয়ে পড়ার পেছনে অর্থনৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হিসাবের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, শুধু ঢাকা শহরেই অন্তত ১৫০টি সক্রিয় কিশোর গ্যাং আছে, যাদের বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে।
গবেষণাটিতে ৮০ জন সাজাপ্রাপ্ত বা শনাক্তকৃত কিশোর অপরাধী এবং ১০ জন বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য লিকার্ট স্কেলের গড় বিশ্লেষণের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়েছে। সেখান থেকে বিস্তারের প্রধান কারণগুলো চারটি বিভাগে চিহ্নিত হয়েছে — অর্থনৈতিক, পারিবারিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক।
কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে পারিবারিক কলহ ও অসহযোগিতা; দারিদ্র্য ও বেকারত্ব; অসৎসঙ্গ, বন্ধুদের চাপ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতা; এবং মাদক গ্রহণ, অস্ত্র, ছিনতাই ও সহিংস আচরণের সঙ্গে পরিচিত হয়ে পড়া।
অন্য কারণগুলো হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপরাধকে গৌরব হিসেবে দেখানো; রাজনৈতিক স্বার্থে কিশোরদের ব্যবহার ও আইন প্রয়োগে দুর্বলতা; স্থানীয় ‘বড় ভাই’ বা মাস্তানদের প্রভাব; এবং খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও সুস্থ বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকা।
গবেষক বিস্তারের অন্যতম কারণ হিসেবে বেকারত্ব ও মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতাকে তুলে ধরেছেন। তিনি সমাজবিজ্ঞানী রবার্ট কে. মার্টনের ‘স্ট্রেইন থিওরি’র উল্লেখ করে বলেন, বৈধ উপায়ে সাফল্যের সুযোগ না পেয়ে কেউ কেউ অবৈধ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে।
সম্প্রতি কুমিল্লায় সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে নিয়ে আইফোন ছিনিয়ে নেওয়া ও কয়েক হাজার টাকা নিয়ে বিরোধের জেরে তারই সঙ্গী বড় ভাইদের হাতে হত্যার ঘটনাটি উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে গবেষক বলেন, পূর্ণ তথ্য ও তদন্তের ফল বিবেচনা না করে এককভাবে কাউকে দায়ী করা ঠিক হবে না। তবে দামি ফোন, বন্ধুদের খোঁজ না রাখা ও অতিরিক্ত পকেটমানি ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাঁর মতে, বয়স ও প্রয়োজন ছাড়িয়ে সপ্তম শ্রেণির এক কিশোরের হাতে লাখ টাকার আইফোন তুলে দিলে সে অপরাধী চক্রের কাছে সহজ ‘টার্গেট’ হয়ে ওঠে, আর হিসাবহীন অর্থ ও বিলাসী বস্তু শো-অফ ও অহংকার তৈরি করে বন্ধুদের মধ্যে হিংসা ও বিরোধের জন্ম দেয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠ সমীকরণে কিশোররা বড় ভাইদের অনুগত হয়ে পড়ে, কিন্তু স্বার্থের দ্বন্দ্বে সেই বড় ভাইরাই ছোট কিশোরদের হত্যা করতেও দ্বিধা করে না। অতিরিক্ত পকেটমানিতে অর্থের অপব্যবহার ও অর্থকেন্দ্রিক বিরোধের সুযোগ বাড়ে বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে কিশোর গ্যাংয়ের উপস্থিতি নতুন নয় বলে গবেষণায় বলা হয়েছে; গত এক-দেড় দশকে নগর এলাকায় এ ধরনের দল দৃশ্যমান হয়েছে। তবে ২০১৭ সালে ঢাকার উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে ‘নাইন স্টার’ ও ‘ডিস্কো বয়েজ’ নামে দুটি গ্যাংয়ের দ্বন্দ্বে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আদনান কবির খুন হওয়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনায় আসে।
ঢাকা ও ঢাকার বাইরের গ্যাংগুলোর ধরনে পার্থক্যের কথাও গবেষণায় এসেছে। ঢাকায় পাড়া-মহল্লাভিত্তিক পরিচয়, এলাকার নিয়ন্ত্রণ, দলীয় সংঘর্ষ ও ছিনতাই আলোচনায় আসে; অন্যদিকে জেলা ও মফস্বল শহরে গ্যাংগুলো মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক কোন্দল, আধিপত্য, জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং প্রভাবশালী নেতাদের শোডাউন ও মিছিলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ধনী পরিবারের সন্তানদের অপরাধে জড়ানোর পেছনে গবেষণায় অভিভাবকদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সময় ও মানসিক সাহচর্য না পাওয়া, অপ্রয়োজনীয় বিপুল পকেটমানি, অনিয়ন্ত্রিত স্বাধীনতা, মাঠের অভাব ও ক্ষমতার মহড়ার মতো কারণের কথা বলা হয়েছে।
গবেষকের পরামর্শ, দামি জিনিস বা পকেটমানি দেওয়ার চেয়ে সন্তানের মানসিক অবস্থা, বন্ধুমহল, মূল্যবোধ ও আচরণের দিকে নজর রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবকদের সন্তানকে সময় দেওয়া, তার বন্ধুমহলকে জানা এবং মানসিক চাপ বা অসংলগ্ন আচরণ দেখলে তাৎক্ষণিক তদারকি নিশ্চিত করার অনুরোধ করেছেন তিনি।




