কিশোররা অপরাধী নয়, তারা ভুল করে: টঙ্গী শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক এমরান খান

শিশু-কিশোরদের বয়স ও মানসিক বিকাশ বিবেচনায় নিয়ে তাদের প্রাপ্তবয়স্ক অপরাধীদের সঙ্গে সাধারণ কারাগারে না রেখে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখা হয়। এসব কেন্দ্রের মূল উদ্দেশ্য শাস্তি নয়; সংশোধন, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাদের সমাজের মূলধারায় ফিরিয়ে আনা।
এসব বিষয়ে গাজীপুর মহানগরীর টঙ্গীতে অবস্থিত শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের (বালক) তত্ত্বাবধায়ক মো. এমরান খান কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তিনি শিশু-কিশোরদের অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে চান না। তাঁর ভাষায়, তারা ভুল করে, কখনো পরিস্থিতির কারণে ভুল পথে চলে যায়।
এমরান খান বলেন, এই ভুলের পেছনে একক কোনো কারণকে দায়ী করা যায় না। প্রথমে ব্যক্তিপর্যায়ে বিষয়টি বুঝতে হবে, এরপর পরিবার, সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা বিবেচনায় নিতে হবে। সামগ্রিক জীবনব্যবস্থায় কিছু কাঠামোগত সমস্যা শিশুদের বিকাশকে প্রভাবিত করে।
তিনি বলেন, একটি শিশুকে ছোটবেলা থেকে শেখাতে হবে কীভাবে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হয়, কীভাবে বন্ধু নির্বাচন করতে হয় এবং মানসিক চাপে নিজেকে সামলাতে হয়। ভালো-মন্দের পার্থক্য ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা পরিবার থেকেই গড়ে তুলতে হবে।
পরিবারের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, একসময় একান্নবর্তী পরিবারে শিশুদের প্রতি নজরদারি ও দেখভালের ব্যবস্থা ছিল। দাদা-দাদি, চাচা-চাচিরা দেরি করে বাড়ি ফিরলে বা পড়াশোনার সময় দুষ্টুমি করলে শাসন করতেন ও পরামর্শ দিতেন। এখন একক পরিবার বাড়ায় সেই নজরদারি অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়েছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অনেক বাবা-মাকে কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়, ফলে দেখভাল, যত্ন, নৈতিক শিক্ষা ও দিকনির্দেশনায় ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় অনেক শিশু মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়ে এবং তত্ত্বাবধান না থাকলে নেতিবাচক প্রভাবের শিকার হতে পারে।
এমরান খান বলেন, শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পরিবেশ তার পরিবার ও সমাজ। কোনো শিশুকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রাখতে হলে চেষ্টা থাকে যথাসময়ে পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার, যেন শিক্ষা ব্যাহত না হয় এবং পরিবার ও সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না হয়।
কেন্দ্রের কাজ সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আচরণগত উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন নিয়ে কাজ করেন। প্রতিটি শিশুর আলাদা প্রতিভা ও সক্ষমতা চিহ্নিত করে বিকাশের সুযোগ দেওয়া হয়। বয়স ও প্রয়োজন অনুযায়ী উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
তিনি জানান, তাঁদের কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা ৩০০ জন, সেই অনুযায়ী জনবল ও ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়। যথাযথ সেবা নিশ্চিত করতে অবকাঠামো ও জনবল উন্নয়ন প্রয়োজন। সরকার এ বিষয়ে একটি প্রকল্প নিয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে অবকাঠামোগত সমস্যার সমাধানে অগ্রগতি হবে বলে তিনি আশা করেন। বিভাগীয় পর্যায়ে আরও কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেবার সুযোগ বাড়বে।
তিনি বলেন, তাঁর কর্মজীবনের অভিজ্ঞতায় কেন্দ্রের মাধ্যমে ইতিমধ্যে প্রায় ৪৫ হাজার শিশুকে সংশোধন ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া শেষে সমাজে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তাঁকে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তাদের প্রায় ৯৭ শতাংশ সমাজে ফিরে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে। বাকি প্রায় ৩ শতাংশের ক্ষেত্রে পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়া নিয়ে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।
কম অপরাধপ্রবণ শিশুদের সঙ্গে অধিক অপরাধপ্রবণ শিশুদের একসঙ্গে রাখার ঝুঁকি নিয়ে তিনি বলেন, এটি শুধু কেন্দ্রের একক সমস্যা নয়। প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। শিশুদের মাদক থেকে দূরে রাখা, নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাওয়া নিশ্চিত করা, নিরাপদ ইন্টারনেট ব্যবহারে সচেতন করা এবং মোবাইল ব্যবহারে বয়সোপযোগী তত্ত্বাবধান রাখা জরুরি।
সবশেষে তিনি বলেন, কোনো শিশুকেই স্থায়ীভাবে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা উচিত নয়। শিক্ষা, যত্ন, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সবার। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে।




