চাকরির প্রলোভনে কম্বোডিয়ায় পাচার: স্ক্যাম সেন্টারে বন্দি বাংলাদেশিরা, ফেরার অপেক্ষায় আরও প্রায় দেড় হাজার
কম্পিউটার অপারেটর, ডেটা এন্ট্রি কর্মী কিংবা কাস্টমার সার্ভিসের চাকরি, মাসে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার বেশি বেতন — এমন প্রস্তাবে বিশ্বাস করে দালালদের হাতে লাখ লাখ টাকা তুলে দিয়ে কম্বোডিয়ায় গিয়েছিলেন তোফায়েল আহমেদ। কিন্তু প্রতিশ্রুত চাকরির বদলে সেখানে তাঁকে একটি চীনা প্রতারক চক্রের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়, কেড়ে নেওয়া হয় তাঁর স্বাধীনতা আর বাধ্য করা হয় অনলাইনে প্রতারণার কাজে।
তোফায়েল দ্য ডেইলি স্টারকে জানিয়েছেন, ডেটা এন্ট্রির চাকরির আশায় তিনি বাংলাদেশি দালালদের ৭ লাখ ৭০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) স্মার্ট কার্ড পাওয়ার পর গত ৩০ এপ্রিল তিনি কম্বোডিয়ায় যান। তবে তাঁকে ডেটা এন্ট্রির কাজের কথা বলা হলেও নিয়োগসংক্রান্ত আমন্ত্রণপত্রে নির্মাণকাজের কথা উল্লেখ ছিল।
দেশটিতে পৌঁছানোর পর এক ব্যক্তি তাঁকে গ্রহণ করে তিন দিন থাকার ব্যবস্থা করেন। এরপর রাতে তাঁকে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার দূরের একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে পৌঁছেই তোফায়েল বুঝতে পারেন, তাঁকে অনলাইন প্রতারণার কাজে নিয়োজিত করার জন্যই আনা হয়েছে।
স্ক্যাম সেন্টারে তাঁর ইংরেজি ভাষার দক্ষতা, টাইপিং আর মানুষকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করার ক্ষমতা যাচাই করা হয়। প্রথমবার ব্যর্থ হলেও দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। তোফায়েলের অভিযোগ, কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে বলা হয় কাজ করতেই হবে; দালালেরা তাঁকে প্রায় দুই হাজার ডলারে চীনা চক্রের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিল এবং মুক্তি পেতে হলে ওই অর্থ তাঁকেই পরিশোধ করতে হবে বলেও জানানো হয়।
প্রায় এক মাস ২৭ দিন ওই স্ক্যাম সেন্টারে ছিলেন তোফায়েল। রাত ১০টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত তাঁকে কাজ করতে হতো। তাঁর ভাষ্য, কাজের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হতো; বৈদ্যুতিক শক দেওয়া এবং খাবার না দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
পালানোর সুযোগ আসে এক রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে। রাত আড়াইটার দিকে প্রায় ১১ ফুট উঁচু দেয়াল টপকে বেরিয়ে খালি পায়ে সাড়ে তিন কিলোমিটার দৌড়ে একটি গাছের নিচে আশ্রয় নেন তিনি। কিন্তু পালিয়ে আসার পরও দুর্ভোগ শেষ হয়নি। দালালেরা এক বছরের ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা দেয়নি, ফলে বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই কম্বোডিয়ায় থাকতে বাধ্য হন তিনি। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের সহায়তার তথ্য জেনে, ভিসার মেয়াদ শেষের জরিমানা মওকুফের সুযোগ কাজে লাগিয়ে টিকিটের ব্যবস্থা করে ২০২৬ সালের ১৪ জুন দেশে ফেরেন তোফায়েল। বর্তমানে তিনি ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহায়তা নিচ্ছেন।
তোফায়েল বলেন, দালালেরা এক ধরনের কাজের কথা বলে মানুষকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে অন্য কাজে বাধ্য করে। তাঁর মতো পরিস্থিতিতে যাতে গ্রামের সাধারণ মানুষ আর না পড়েন, সে জন্য গণমাধ্যমের জোরালো ভূমিকা চান তিনি।
তোফায়েল একা নন। চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশিদের কম্বোডিয়ায় নেওয়ার ক্ষেত্রে কম্পিউটার অপারেটর, ডেটা এন্ট্রি কর্মী ও কাস্টমার সার্ভিসের চাকরির কথা বলা হয়। মাসে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার বেশি বেতনের প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হয়ে অনেকে দালালদের দুই থেকে সাত লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছেন। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর পর কারও কারও পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয়, কড়া পাহারায় আটকে রেখে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণার কাজে বাধ্য করা হয়। কাজে অস্বীকৃতি জানালে নির্যাতন এবং মুক্তির জন্য অর্থ দাবির অভিযোগও রয়েছে।
কম্বোডিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপ-মুখপাত্র টাচ সোখাকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশটি থেকে ৯৬টি দেশের মোট ৭২ হাজার ৪২৬ বিদেশি নাগরিককে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৩ হাজার ৩৬৪ জন বাংলাদেশি। এদের মধ্যে ৮৫২ জনকে অনলাইন প্রতারণার সঙ্গে জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করেছে কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষ।
অন্যদিকে দেশটির অভিবাসন বিভাগের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ৮৭টি দেশের ৫২ হাজার ৩৯ জন নাগরিককে আটক ও বহিষ্কার করা হয়েছে। এ সময় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ৩ হাজার ১০৪টি অভিযান পরিচালনা করে। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় বহিষ্কারের সংখ্যা বেড়েছে ৪১ হাজার ৬৮৫ জন। বহিষ্কৃতদের মধ্যে প্রায় ২৩ হাজার চীনা নাগরিক রয়েছেন; এরপর আট হাজারের বেশি ইন্দোনেশীয়, চার হাজারের বেশি ভিয়েতনামি এবং তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশি। এ ছাড়া আড়াই হাজারের বেশি পাকিস্তানি, প্রায় দুই হাজার মিয়ানমারের এবং দেড় হাজারের বেশি থাই নাগরিককে বহিষ্কার করা হয়েছে। অভিবাসন বিভাগের তথ্যের বরাতে কম্বোডিয়াভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিটিভি নিউজ গ্লোবাল জানিয়েছে, অনলাইন প্রতারণাবিরোধী অভিযানে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নয় মাসে কম্বোডিয়া থেকে তিন হাজারের বেশি বাংলাদেশিকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে বহিষ্কৃত বাংলাদেশিদের মধ্যে কতজন প্রতারণায় সরাসরি জড়িত ছিলেন আর কতজন মানবপাচারের শিকার হয়ে এসব কর্মকাণ্ডে বাধ্য হয়েছেন, তার সুনির্দিষ্ট হিসাব প্রকাশ করা হয়নি।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম বিএমইটির তথ্যের বরাতে জানিয়েছে, ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৯৬৩ বাংলাদেশি কম্বোডিয়ায় কাজের অনুমতি বা ক্লিয়ারেন্স নিয়েছেন। সংস্থাটির তথ্যমতে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ৫৮৩ বাংলাদেশিকে কম্বোডিয়া থেকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ১০৯ জনকে স্ক্যাম সেন্টার থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এই পরিসংখ্যানের বাইরে আরও কতজন পাচারের শিকার হয়ে আটকা রয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি।
কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া বাংলাদেশিদের দেশে ফেরাতে সহায়তা চেয়ে থাইল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনের কাছে ১ হাজার ৭৯৬ জন আবেদন করেছেন। ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের মধ্যে ৩০০ থেকে ৪০০ জন ইতোমধ্যে দেশে ফিরেছেন; আনুমানিক ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ বাংলাদেশি এখনো ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন। গত ২০ অক্টোবর আরও ৩০ বাংলাদেশি দেশে ফেরেন; কম্বোডিয়া ছাড়ার চেষ্টা করার সময় আটক হওয়ার পর বাংলাদেশ মিশনের হস্তক্ষেপে তাঁরা মুক্তি পান।



