কুষ্টিয়ায় ছয়জন হত্যা: হানিফসহ আওয়ামী লীগের চার নেতার মামলার রায় আজ, সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়েছে প্রসিকিউশন
চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণা করা হবে আজ বৃহস্পতিবার। এই রায়ের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চার নেতার ভাগ্য।
মামলায় আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফের পাশাপাশি আসামি রয়েছেন দলটির কুষ্টিয়া জেলা সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী ও শহর সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা। চার আসামিই বর্তমানে পলাতক; তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্রের খরচে নিয়োগ পাওয়া আইনজীবী আমির হোসেন আইনি লড়াই করছেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ এনেছে প্রসিকিউশন। প্রথম অভিযোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে হানিফের উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তার কথা বলা হয়েছে; দ্বিতীয় অভিযোগে কুষ্টিয়ায় আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের নির্দেশের কথা উল্লেখ রয়েছে; তৃতীয় অভিযোগটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় চার নেতার সংশ্লিষ্টতা নিয়ে।
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ১৫, ১৭ ও ৩০ জুলাই এবং ৩ আগস্ট আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন হানিফ এবং এসব বৈঠক বা সভায় দেওয়া উসকানিমূলক বক্তব্যকে তিনি সমর্থন করেন। এ ছাড়া ২৯ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবে একটি আলোচনা সভায় দেওয়া বক্তব্যে আন্দোলনকারীদের ‘জামায়াত’, ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘সাম্প্রদায়িক’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলন দমনে হত্যা-নির্যাতনের উসকানি, প্ররোচনা ও সহায়তা দেন তিনি।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকারের ক্ষমতা নিরঙ্কুশ ও দীর্ঘস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনাকে সমর্থন করেন হানিফ। ড্রোনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের শনাক্ত করে অবস্থান ও লক্ষ্য নির্ধারণ এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালিয়ে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনা কার্যকর করার সিদ্ধান্তেও তাঁর সমর্থন ছিল বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ২৭ জুলাই কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হানিফের নেতৃত্বে সদর উদ্দিন খান, আজগর আলী, আতাউর রহমান আতাসহ অন্য নেতারা বৈঠক করেন। বৈঠকে নিরীহ-নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করে কুষ্টিয়া শহরে আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ বল প্রয়োগের নির্দেশ দেন হানিফ।
তৃতীয় অভিযোগটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরে ছয়জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা নিয়ে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে রাজপথে নামেন কুষ্টিয়ার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। সকাল ১০টার দিকে হাজারো ছাত্র-জনতা শহরের হাসপাতাল মোড়ে জড়ো হয়ে চৌড়হাস থেকে মজমপুরের দিকে শান্তিপূর্ণভাবে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন; কিন্তু হানিফের পরিকল্পনা ও নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালান আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা, এ সময় তাঁদের ছত্রছায়া দেয় পুলিশ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশের সঙ্গে একত্রে গুলি চালানো হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৫ আগস্ট দুপুর দেড়টা থেকে বিকেল চারটার মধ্যে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে গুলিতে ছয়জন নিহত হন। আশরাফুল ইসলাম বক চত্বরের প্রায় ৫০ গজ উত্তরে, সুরুজ আলী বাবু বার্মিজ গলিতে, আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন ও উসামা হরিপুরগামী সড়কে আড়ংয়ের সামনে, বাবলু ফরাজী তুলাপট্টির গলিতে এবং ইউসুফ শেখ ফায়ার সার্ভিসের বিপরীত দিকে সড়কে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান।
প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম বলেন, হানিফ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলন দমনে সরকারের অংশ হিসেবে সিদ্ধান্তটি মেনে নিয়েছিলেন; একই সঙ্গে অধীনস্থদের মাধ্যমে আন্দোলন দমনে সবকিছু বাস্তবায়ন করেছিলেন। তিনি সিভিলিয়ান লিডার ছিলেন এবং অধীনস্থদের নির্দেশ বা টেলিফোনে কথোপকথন করে এসব বাস্তবায়ন করেছেন বলে প্রসিকিউটর জানান।
গাজী এমএইচ তামিম আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা, সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দীন নাছিমকে একই অপরাধে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল; অতএব একই অবস্থানে থেকে মাহবুবউল আলম হানিফকেও ট্রাইব্যুনাল একই শাস্তি দেবেন বলে তাঁরা আশা করছেন। গত ৫ অক্টোবর হানিফসহ চার আসামির সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করে রাষ্ট্রপক্ষ।
মামলার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে প্রসিকিউশনের তথ্যে বলা হয়েছে, তদন্ত শুরু হয় ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ; ওই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়, ৫ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন এবং পরদিন তা আমলে নেওয়া হয়। পরে চার আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২।
মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ রাষ্ট্রপক্ষে মোট ১৯ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন; এ ছাড়া ৩৬ সিরিজের নথি ও পাঁচটি বস্তুগত প্রদর্শনী উপস্থাপন করা হয়। যুক্তি-পাল্টা যুক্তি খণ্ডন শেষ হওয়ার পর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল-২। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) একই ট্রাইব্যুনাল বৃহস্পতিবার রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন।


