স্পেনে ট্রেন দুর্ঘটনায় তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা প্রধানমন্ত্রী সানচেজের, নিরাপত্তা ত্রুটি পেলে দ্রুত সমাধানের আশ্বাস

স্পেনে মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনার পর দেশটিতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) থেকে এই রাষ্ট্রীয় শোক কার্যকর হয়েছে।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকালে স্পেনের মধ্যাঞ্চলের তোলেদো প্রদেশে দুর্ঘটনাটি ঘটে। মাদ্রিদ থেকে সেভিলের দিকে যাওয়া একটি ট্রেন লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা আরেকটি ট্রেনে ধাক্কা দেয়। এতে অন্তত ৬৮ জন নিহত হয়েছেন এবং কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়েছেন। ধাক্কার তীব্রতায় কয়েকটি বগি একটি খাদে পড়ে যায়।
দুর্ঘটনাটি ঘটে সকাল ৯টার কিছু পর, মাদ্রিদের প্রায় ১৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে। বেসরকারি রেল পরিচালক ইরিওর দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনটিতে ১৪৭ জন যাত্রী ছিলেন। ইরিও জানিয়েছে, তাদের ট্রেনটিকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় রাষ্ট্রীয় রেল কোম্পানি রেনফের একটি ট্রেন, যাতে ৩৯৭ জন যাত্রী ছিলেন।
পরিবহনমন্ত্রী অস্কার পুয়েন্তে জানিয়েছেন, কম্পিউটার বা সিস্টেম ত্রুটির পর মানবিক ভুলের কারণে এই সংঘর্ষ ঘটেছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সিগন্যাল ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে মাদ্রিদের একটি নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ট্রেন পরিচালনার দায়িত্ব নেয় এবং সেখানে থাকা সব ট্রেনকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে থামার সংকেত দেওয়া হয়। এরপর দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা লালবাতি থাকা সত্ত্বেও রেনফে ট্রেনটিকে চলার অনুমতি দেন, তবে কোনো গতিসীমাও বেঁধে দেওয়া হয়নি। রেনফে ট্রেনটি ২৫ কিলোমিটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ইরিও ট্রেনটিকে সজোরে ধাক্কা দেয়। পুয়েন্তে এই সিদ্ধান্তকে ‘অব্যাখ্যেয়’ বলে বর্ণনা করেছেন।
দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী সানচেজ বলেন, ‘পুরো স্পেন শোকাহত। জীবন ভেঙে গেছে, পরিবারগুলো ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে, যন্ত্রণা অপরিসীম।’ একই সঙ্গে রেলওয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ধরনের ত্রুটি পাওয়া গেলে তা দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
সানচেজ বলেন, চলতি বছরের শুরুতে স্পেনের একই রেলপথে ঘটে যাওয়া আরেকটি দুর্ঘটনায় বহু মানুষ নিহত হয়েছিল। তবে প্রাথমিক পর্যালোচনায় মনে হচ্ছে, বর্তমান দুর্ঘটনার সঙ্গে পূর্বের ওই ঘটনার কোনো মিল নেই। তবু পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পরই এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে তিনি জানান।
উচ্চগতির রেলব্যবস্থার ওপর জনআস্থা ফেরানোর ওপর জোর দিয়ে সানচেজ আরও বলেন, স্পেনের মতো দেশে একই বছরে উচ্চগতির ট্রেনের দুটি দুর্ঘটনা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই খাতে যাত্রীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিষয়টির গভীরে যাওয়া হবে এবং অবহেলা ছিল কি না তা খতিয়ে দেখা হবে।
বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা ভয়াবহ দৃশ্যের বর্ণনা দিয়েছেন। রেনফে ট্রেনের ৬২ বছর বয়সী যাত্রী সালভাদর আরিজা ধাক্কার শক্তিকে ‘নির্মম’ বলে বর্ণনা করে বলেন, যাত্রীরা জানালা ভেঙে বের হতে শুরু করেন এবং কেউ কেউ আসনের মধ্যে আটকে থেকে নড়তে পারছিলেন না। ইরিও ট্রেনের ২২ বছর বয়সী যাত্রী তাঙ্গি বিনিয়ের বলেন, স্যুটকেস উড়তে শুরু করে এবং মানুষ চিৎকার করতে থাকে; তাঁর বাবা নিতম্ব ভাঙা একটি মেয়েকে ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করে আনেন।
ঘটনাস্থলে কয়েক ডজন অ্যাম্বুলেন্স ছুটে যায় এবং সবচেয়ে গুরুতর আহতদের হেলিকপ্টারে করে সরিয়ে নেওয়া হয়। স্পেনের সিভিল গার্ড জানিয়েছে, কিছু ভুক্তভোগীকে শনাক্ত করতে স্বজনদের ডিএনএ নমুনা লাগবে।
এই দুর্ঘটনাকে আধুনিক ইউরোপের সবচেয়ে ভয়াবহ রেল দুর্ঘটনাগুলোর একটি এবং ২০১৩ সালের পর স্পেনের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ট্রেন বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে; ২০১৩ সালে সান্তিয়াগো দে কম্পোস্তেলার উপকণ্ঠে ৮০ জন নিহত হয়েছিলেন। বুধবার সানচেজসহ স্পেনের রাজনীতিকরা সব সরকারি কর্মসূচি বাতিল করেন, যার মধ্যে আগামী মাসের সংসদ নির্বাচনের প্রচারণাও ছিল। প্রধান বিরোধী পিপলস পার্টির নেতা আলবের্তো নুনিয়েজ ফেইহো বলেন, স্পেনের অধিকার রয়েছে তার অবকাঠামো নিয়ে কী ঘটছে তা জানার। ট্রেড ইউনিয়ন সিএসআইএফ পরিবহনমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছে।



