ধানখেত থেকে হারিয়ে যাচ্ছে খলশে মাছ: কীটনাশক, হারানো জলাশয় আর কারেন্ট জালে বিপন্ন ছোট্ট মাছটি

একসময় বর্ষায় ধানখেতে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরত খলশে মাছ, এখন গ্রামে গেলেও সেই মাছের দেখা মেলে না বললেই চলে। অনেক কিশোর এই মাছের নামই শোনেনি, অথচ বয়স্কদের কাছে এখনো শোনা যায়, তাঁরা ঝুড়ি ভরে খলশে আনতেন আর গামছা দিয়ে ছেঁকে এই মাছ ধরা হতো।
মাছটি দেখতে সুন্দর হলেও আকারে ছোট—লম্বায় বড়জোর ১০ সেন্টিমিটার। গায়ে নীলচে আর কমলা রঙের আড়াআড়ি ডোরা থাকে, আর পেটের কাছ থেকে ঝুলে থাকে সুতার মতো দুটি পাখনা। এগুলো দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে পথ চেনে বলে ঘোলা পানিতেও তার চলতে অসুবিধা হয় না। এলাকাভেদে একে খলশে বা খইলসা বলা হয়; এটি গুরামি গোত্রের মাছ, অ্যাকুয়ারিয়ামের রঙিন গুরামির আত্মীয়।
ধানখেতই ছিল খলশের আদর্শ ঘর। সেখানে পানি অল্প, স্রোত নেই, ধানের গোড়ায় ঘাসপাতা জমে থাকে—লুকানোর জায়গা আর খাবার দুটোই মেলে। মশার লার্ভা, ছোট পোকা আর পানির খুদে প্রাণী তার খাবার।
মাছটির মাথার কাছে ‘ল্যাবিরিন্থ’ নামে বাড়তি একটি শ্বাসঅঙ্গ আছে। তাই সে মাঝেমধ্যে পানির ওপরে উঠে সরাসরি বাতাস নিতে পারে এবং পানিতে অক্সিজেন কম থাকলেও তার দম আটকায় না।
বর্ষায় প্রজননের সময় পুরুষ খলশে মুখে বাতাস নিয়ে পানির ওপরে বুদ্বুদ ছেড়ে ভাসমান বাসা বানায়। মা মাছ ডিম পাড়লে বাবা মাছ ডিমগুলো তুলে সেই বুদ্বুদের চাকের ভেতর রাখে। ডিম ফুটতে সাধারণত এক-দুদিন লাগে, আর এই সময় বাবা মাছ বাসা পাহারা দেয়। এই বাসার জন্য দরকার শান্ত পানি আর ঘন জলজ উদ্ভিদ—অগভীর ধানখেত ঠিক সেটাই দিত।
সেই শান্ত পরিবেশ এখন আর নেই। প্রথম ধাক্কা এসেছে কীটনাশক থেকে। ধানে পোকা ধরলে কৃষক বিষ ছিটান, কিন্তু সেই বিষ খেতের পানিতেই মিশে যায়। বড় মাছ কিছুটা সহ্য করলেও ডিম আর পোনা সহ্য করতে পারে না, আর খলশের খাবার পোকামাকড়ও মরে যায়। রাসায়নিক সারও বৃষ্টির পানির সঙ্গে খালবিলে নেমে পানির গুণ নষ্ট করে।
দ্বিতীয় ধাক্কা জলাশয় হারানো। আগে মাঠের পাশে ডোবা আর ছোট খাল থাকত; শুকনা মাসে মাছ সেখানে আশ্রয় নিত, বর্ষায় আবার খেতে ছড়িয়ে পড়ত। এখন অনেক ডোবা ভরাট হয়ে বাড়ি বা রাস্তা উঠেছে, খালগুলো সরু হতে হতে মরে গেছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণের বাঁধ আর স্লুইসগেটও নদী থেকে মাঠে মাছের যাতায়াত আটকে দিয়েছে।
তৃতীয় সমস্যা সেচ। বোরো মৌসুমে গভীর নলকূপ আর পাম্প দিয়ে মাটির নিচ থেকে পানি তোলায় আশপাশের জলাশয় আগেভাগেই শুকিয়ে যায়। চাষের সময় আর ধানের জাত বদলে যাওয়ায় মাছের জীবনের সঙ্গে মাঠের পুরোনো মিলও ভেঙে গেছে।
চতুর্থ সমস্যা অতিরিক্ত মাছ ধরা। আগে মানুষ গামছা আর ঝুড়ি দিয়ে ধরত; এখন ঘন সুতার জাল আর কারেন্ট জাল চলে। কারেন্ট জাল বাংলাদেশে নিষিদ্ধ, তবু অনেক জায়গায় ব্যবহার হয়। প্রজননের সময় ডিমওয়ালা মাছ ধরা পড়লে পরের বছরের ঝাঁক আর হয় না। শখের অ্যাকুয়ারিয়ামের জন্য ধরাও এর একটি কারণ।
এত ছোট মাছ হারালে ক্ষতি আছে। খলশে মশার লার্ভা খায়, আবার বক আর মাছরাঙার মতো পাখির খাবারও হয়—খাদ্যশৃঙ্খলের মাঝখান থেকে একটি কড়ি খসলে দুই দিকেই টান পড়ে। ছোট দেশি মাছ পুষ্টিরও ভালো উৎস; এতে ভিটামিন এ, ক্যালসিয়াম, আয়রন আর জিংক থাকে। বাংলাদেশের মিঠাপানিতে আড়াই শর বেশি প্রজাতির মাছ আছে, যার বড় অংশই খলশের মতো ছোট মাছ, আর এদের অনেকগুলোর সংখ্যা কমছে।
মাছ ফেরানোর উপায়ও আছে। ধানের সঙ্গে মাছ চাষ করলে মাছ খেতে পোকা খায়, তাতে কীটনাশক কম লাগে—বাংলাদেশের কিছু এলাকায় কৃষকেরা এই পদ্ধতি চালু করেছেন। সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনায় পোকা দমনে আগে প্রাকৃতিক শত্রু পোকা আর হাতে বাছাই কাজে লাগানো হয়, বিষ লাগে শেষে। ডোবা আর খাল টিকিয়ে রাখা এবং বর্ষায় ডিমওয়ালা মাছ না ধরাও ঝাঁক বাড়ার সুযোগ দেয়।




