এলপিজি ব্যবসায়ীদের কমিশন বাড়ানোর দাবিতে আজ বিয়ামে বিইআরসির গণশুনানি

সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা নিয়মিত দাম বেঁধে দিলেও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য এলপি গ্যাসের দাম প্রায় এক বছর ধরে কার্যত নিয়ন্ত্রণহীন। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো বাড়তি দামের জন্য কমিশন ও পরিবহন ব্যয়সহ নানা যুক্তি দেখাচ্ছে। এমন প্রেক্ষাপটে মুনাফার কমিশন বাড়াতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে যাচ্ছেন বেসরকারি এলপিজি ব্যবসায়ীরা।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে আমদানিকারকেরা দুই থেকে আড়াই গুণ এবং পরিবেশকেরা তিন গুণ কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন। এসব প্রস্তাবের ওপর আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিয়াম মিলনায়তনে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত গণশুনানির আয়োজন করেছে বিইআরসি।
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে থাকার সময় গত বছরের নভেম্বরে এলপিজির বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। চাহিদার তুলনায় আমদানি কম—এমন অজুহাত দেখিয়ে প্রতিটি সিলিন্ডারে নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি আদায় শুরু করেন বিক্রেতারা। দেশের বহু এলাকায় এলপি গ্যাস না পেয়ে ভোগান্তি শুরু হয়। এরপর ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে শুল্ক হ্রাস, আমদানির সীমা বৃদ্ধি ও এলসি খোলা সহজ করা—সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু সবশেষ তিন মাস ধরে আবার এলপি গ্যাসের দামে অরাজকতা চলছে। মাঝে এক মাসে দুইবার দাম বৃদ্ধি করিয়ে নেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু তাতেও নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি পাননি ভোক্তারা।
এবার পর্যাপ্ত আমদানি হওয়া সত্ত্বেও গত সেপ্টেম্বর থেকে ১২ কেজির সিলিন্ডার অন্তত এক হাজার টাকা বাড়িয়ে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি শুরু হয়। অক্টোবরে পণ্যটির নির্ধারিত দাম ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হয়। কিন্তু তাতেও বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সরকার। আগের মতোই ১২ কেজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
বিইআরসির কাছে জমা পড়া আবেদনে দেখা যায়, ১২ কেজি সিলিন্ডারের কমিশন ১৯১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ওমেরা ৪৭৮ টাকা, পেট্রোম্যাক্স ৩৪৯ টাকা, ডেল্টা ৩৬০ টাকা এবং মেঘনা গ্রুপ ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। অন্যদিকে পরিবেশকেরা ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতারা ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা নির্ধারণের আবেদন দিয়েছেন।
এলপিজি আমদানির ব্যবসায় ৩০টি নিবন্ধিত কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি কোম্পানি এখন নিয়মিত আমদানি করে থাকে। আর আমদানিকারকদের থেকে গ্যাস সংগ্রহ করে নিজস্ব প্ল্যান্টে বোতলজাত করার কাজে যুক্ত আছে ১২টি প্রতিষ্ঠান। একসময় বাজারে নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে থাকা বসুন্ধরা ও বেক্সিমকো পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যবসা বন্ধ রেখেছে।
দাবি আদায়ে চাপ সৃষ্টি করতে ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। সরকারের কড়া হুঁশিয়ারি ও গণশুনানির তারিখ ঘোষণার পরপরই ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হয়।
দেশে প্রতিমাসে এলপিজির চাহিদা রয়েছে দেড় লাখ টন। গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ১ লাখ ৫৬ হাজার ও ১ লাখ ৫৭ হাজার টন করে এলপিজি আমদানি হয়েছে। অক্টোবর মাসেও সমপরিমাণ আমদানি হবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। অর্থাৎ আমদানি হচ্ছে চাহিদার চেয়েও কিছুটা বেশি।
২০২১ সালের এপ্রিলে প্রথমবারের মতো মাসে মাসে এলপিজির দর ঘোষণার নিয়ম চালু হয়। তখন ১২ কেজির সিলিন্ডারে কমিশন ধরা হয়েছিল ১৪৩ টাকা। তবে আমদানিকারক বা অপারেটরদের দাবির মুখে তা বাড়িয়ে ১৮৬ টাকা এবং পরে ১৯১ টাকা করা হয়।
আওয়ামী লীগের শেষ দফায় টানা দীর্ঘ দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার সময় বেশ কয়েকবার কমিশন বা মুনাফার হার বাড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন আমদানিকারকেরা। তবে তখন তারা সফল হননি। জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার শাসনের অবসানের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় আবার তারা এদিকে সচেষ্ট হয়েছেন।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধিসহ নানা কারণে বেসরকারি এলপি গ্যাসের সাড়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য সরকার ১ হাজার ৯১৩ টাকা নির্ধারণ করে দিলেও সরকারের নিজের কোম্পানি এলপি গ্যাস লিমিটেডের একই পণ্যের নির্ধারিত দাম মাত্র ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা।




