যুক্তরাষ্ট্রে এবার উষ্ণ ও আর্দ্র শীতের পূর্বাভাস, শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রে এবারের শীত স্বাভাবিকের চেয়ে উষ্ণ ও আর্দ্র হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছেন আবহাওয়াবিদরা। জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (এনওএএ) বলছে, শক্তিশালী এল নিনো বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরন বদলে দিচ্ছে।
এনওএএর সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের বড় অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকবে। কয়েকটি অঞ্চলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতও হবে। এল নিনোর বছরগুলো পূর্ব উপকূল ও পশ্চিম উপকূলে উপকূলীয় বন্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে জানানো হয়েছে।
এনওএএর জাতীয় আবহাওয়া পরিষেবার পরিচালক কেন গ্রাহাম অক্টোবরের এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে বলেন, ‘এই শীতে আসছে একটি শক্তিশালী, এমনকি ঐতিহাসিক এল নিনো।’ তবে পূর্বাভাসকারীরা সতর্ক করে বলেছেন, এসব পূর্বাভাস শুধুই পূর্বাভাস — এল নিনো নির্দিষ্ট অবস্থার সম্ভাবনা বাড়ায়, নিশ্চয়তা দেয় না।
গ্রাহাম বলেন, মৌসুমি পূর্বাভাস শহরগুলোকে সম্ভাব্য প্রভাবের জন্য প্রস্তুত হতে এবং সম্পদ বরাদ্দ করতে সাহায্য করে। তাঁর ভাষায়, আগাম ও ভালো সিদ্ধান্ত জীবন বাঁচায়।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ধরন, যা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরে শুরু হয়। কয়েক বছর পরপর পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল এলাকার পানি নিরক্ষরেখার কাছে উষ্ণ হয়ে ওঠে এবং বিপুল তাপ বায়ুমণ্ডলে ছাড়ে, ফলে বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরন বদলে যায়। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এ বছর রেকর্ডের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো দেখা যেতে পারে।
নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির জলবায়ুবিজ্ঞানী জশ উইলিস এল নিনোর আকার ও প্রভাব বোঝাতে ‘গডজিলা’ শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, এটি ইন্দোনেশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তীব্র খরা ও বড় দাবানল ডেকে আনে, আবার প্রশান্ত মহাসাগরের অপর প্রান্তে হারিকেন, ঝড় ও উচ্চ জোয়ার বাড়ায়।
২০১৫-১৬ সালের আরেকটি শক্তিশালী এল নিনোর সময় সাউথ ক্যারোলাইনায় ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল এবং পূর্ব উপকূলে তুষারঝড় আঘাত হেনেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবার উত্তর ক্যালিফোর্নিয়ায় উষ্ণ তাপমাত্রা এবং রাজ্যজুড়ে, বিশেষ করে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ায় স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। নেভাদা, দক্ষিণ রকি পর্বতমালা ও ক্যালিফোর্নিয়ার সান বার্নার্ডিনো পর্বতে বেশি তুষারপাতের সম্ভাবনাও রয়েছে।
অক্টোবরের শুরুতে একটি কেলভিন তরঙ্গ পশ্চিম উপকূলে পৌঁছায়। উষ্ণ পানির এই বড় ঢেউ উপকূল ধরে উত্তরে এগিয়ে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায়, সঙ্গে বন্যার ঝুঁকি ও উষ্ণ সমুদ্র তাপমাত্রা নিয়ে আসে। নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ডিলন আমায়া বলেন, কেলভিন তরঙ্গ নিজে বন্যা ঘটায় না, তবে বন্যার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলেও উষ্ণ তাপমাত্রার পূর্বাভাস রয়েছে, তবে সেখানে কিছু অংশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। ঠান্ডা না পড়লে তুষারস্তর ছোট হবে বলে পূর্বাভাসকারীরা বলছেন — অথচ গভীর তুষারস্তর পানি ধরে রেখে খাল-বিল ও জলাধার টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে।
দক্ষিণ-পশ্চিমে ইতিমধ্যে আর্দ্র আবহাওয়া দেখা যাচ্ছে। নিউ মেক্সিকো, কলোরাডো, অ্যারিজোনা ও ইউটার মিলনস্থল ফোর কর্নার্স এলাকায় অক্টোবরের শেষে তীব্র বন্যায় পানির উচ্চতা বেড়ে ছাদ থেকে উদ্ধার ও সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। এলাকাটিতে দুই মাস ধরে অস্বাভাবিক আর্দ্র আবহাওয়া ছিল।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল সোয়াইন বলেন, সাম্প্রতিক বন্যার জন্য এল নিনো আংশিকভাবে দায়ী। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, আর্দ্র আবহাওয়া মানেই কলোরাডো নদী অববাহিকার পানিসংকটের অবসান নয় — লেক পাওয়েল ও লেক মিডের পানি রেকর্ড নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।
উত্তর-পূর্ব ও মধ্য-আটলান্টিক অঞ্চলেও উষ্ণ তাপমাত্রা ও বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এল নিনো নরইস্টার ঝড়কে শক্তিশালী করতে পারে, যা উচ্চ জোয়ারের সঙ্গে উপকূলীয় ক্ষয় ঘটায়। গ্রাহাম বলেন, উত্তর যুক্তরাষ্ট্রে শীত স্বাভাবিকের চেয়ে মৃদু হলেও তুষারপাতের ঝুঁকি মুছে যায় না। ২০১৬ সালের শক্তিশালী এল নিনোর সময় উত্তর-পূর্বে এক তুষারঝড়ে ৩০ ইঞ্চির বেশি তুষার ও ঘণ্টায় ৬০ মাইল বেগে ঝোড়ো হাওয়া হয়েছিল।
দক্ষিণ যুক্তরাষ্ট্রে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এনওএএর আবহাওয়াবিদ জন গটশাল্ক বলেন, উত্তর টেক্সাসের মতো যেসব এলাকায় তুষার প্রায় দেখাই যায় না, সেখানেও তুষার পড়তে পারে। ফ্লোরিডার উত্তর অংশ এবং জর্জিয়া ও সাউথ ক্যারোলাইনার দক্ষিণ অংশে এই শীতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে সবচেয়ে বেশি বলে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে।


