তেহরান বৈঠকে হুতি হামলা থামার নিশ্চয়তা মেলেনি, আলোচনা চালিয়ে যেতে রাজি পক্ষগুলো

ইরানের রাজধানী তেহরানে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিনিধিদের বৈঠকে উত্তেজনা কমানোর বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো সমঝোতা হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনা অব্যাহত রাখতে সম্মত হয়েছে।
অঞ্চলের সংঘাত নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের অংশ হিসেবে সোমবার তেহরানে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক মক্কা চুক্তির অংশীদার।
সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি ইরান সফর করে। বৈঠকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইব্রাহিম কালিনও অংশ নেন।
বৈঠক শেষে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, পক্ষগুলো আলোচনা চালিয়ে যেতে সম্মত হয়েছে। তবে আলোচনা সম্পর্কে অবহিত আঞ্চলিক সূত্রগুলোর দাবি, এতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের প্রতিনিধিরা ইরানকে অনুরোধ জানান, তাদের সমর্থনপুষ্ট হুতিদের সৌদি আরবে হামলা বন্ধ করতে বলতে। তবে ইরান দাবি করেছে, ইয়েমেনে তাদের মিত্রদের ওপর এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার মতো যথেষ্ট প্রভাব তাদের নেই।
সৌদি আরবের শহরগুলোতে হুতিদের হামলা বন্ধের বিষয়েও কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। তেহরানের একটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান এ বিষয়ে সহায়তা করতে প্রস্তুত, তবে হুতিদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি; তাদের শর্ত হলো, লড়াই বন্ধের আগে সৌদি আরবকে ইয়েমেনের ওপর থেকে আকাশ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে।
এর পরিবর্তে ইরান অতিথিদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনকে তেহরানের প্রস্তাব মেনে নিতে রাজি করানোর অনুরোধ জানায়। ইরান পুরো অঞ্চলজুড়ে দুই সপ্তাহের জন্য শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ রাখার প্রস্তাব দিয়েছে; এর বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি ধীরে ধীরে পুনরায় খুলে দেওয়ার মাধ্যমে আলোচনা আবার শুরু করার সুযোগ তৈরি হবে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
ইয়েমেনের আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, হুতিদের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে চূড়ান্ত আলোচনা ইয়েমেনের রাজধানী সানায় অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। তেহরানের ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, শিগগিরই দ্বিতীয় দফার আলোচনা হতে পারে এবং তুরস্কে দ্বিতীয় দফার বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে গত জুলাইয়ে, যখন ইয়েমেনের রাজধানী সানার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান হামলা চালানো হয়। হুতিরা এ হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে; তবে সৌদি আরব-সমর্থিত ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার হামলার দায় স্বীকার করে জানায়, অনুমতি ছাড়া একটি ইরানি বিমান যাতে অবতরণ করতে না পারে, সে জন্য রানওয়েকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছিল।
এরপর হুতিরা ‘অবরোধের জবাবে অবরোধ’ নীতি ঘোষণা করে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজ চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেয়। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ার পর লোহিত সাগর সৌদি আরবের তেল রপ্তানির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠেছে।
আঞ্চলিক একটি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল একটি আঞ্চলিক অনাক্রমণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব মোহসেন রেজায়ী রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেছেন, আলোচনাগুলো ‘খুব ভালো’ হয়েছে এবং ইরান ও মক্কা চুক্তির তিন অংশীদার দেশ একমত হয়েছে যে বাইরের শক্তির পরিবর্তে আঞ্চলিক দেশগুলোকেই নিজেদের অঞ্চলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংলাপ সহজতর করতে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রিন্স খালিদ বিন সালমান এর আগে সর্বশেষ ২০২৫ সালের এপ্রিলে তেহরান সফর করেছিলেন এবং সে সময় তিনি সৌদি বাদশাহ সালমানের পক্ষ থেকে ইরানের তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতার কাছে একটি বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন।
তেহরানে বৈঠক শেষ হওয়ার পরও উত্তেজনা অব্যাহত থাকার চিত্র সামনে আসে। সৌদি নেতৃত্বাধীন ইয়েমেনের জোট জানায়, তারা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের দিকে ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত ও ধ্বংস করেছে, দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে ছোড়া চারটি ড্রোন প্রতিহত করেছে এবং পরে রিয়াদের দিকে ছোড়া আরও দুটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।




