লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলের পার্লামেন্টে তুরস্কের সামুদ্রিক চুক্তি অনুমোদন: পূর্ব ভূমধ্যসাগরে নতুন সমীকরণ
একসময়ের প্রতিপক্ষ থেকে এখন ঘনিষ্ঠ অংশীদার—লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে তুরস্কের রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। পূর্ব লিবিয়ার তবরুকভিত্তিক পার্লামেন্ট বছরের পর বছর ধরে বিরোধিতার পর সম্প্রতি তুরস্ক ও ত্রিপোলির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের মধ্যে ২০১৯ সালে স্বাক্ষরিত সামুদ্রিক সীমানা চুক্তিটি অনুমোদন করেছে।
এই চুক্তিতে ভূমধ্যসাগরে তুরস্ক ও লিবিয়ার দাবি করা সামুদ্রিক এখতিয়ারের এলাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে গ্রিস, সাইপ্রাস ও মিসর যুক্তি দিয়ে আসছে, চুক্তিটি তাদের সার্বভৌম অধিকার লঙ্ঘন করে; তুরস্ক বলছে, এটি আন্তর্জাতিক আইন মেনেই করা হয়েছে।
তুরস্কের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, পূর্ব লিবিয়ার নেতারা এখন আঙ্কারার উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছেন। তাঁর ভাষায়, “তুরস্ক সেখানে নিজের স্বার্থে লিবিয়াকে ব্যবহার করতে যায়নি।” তিনি আরও বলেন, “শুরু থেকেই আমরা ‘এক লিবিয়া’ নীতি সমর্থন করে এসেছি,” এবং দেশটির স্থিতিশীলতা ও সম্পদের সুফল সব লিবিয়ানের কাছেই পৌঁছানো উচিত।
২০১৯-২০ সালে পূর্বাঞ্চলীয় সামরিক নেতা খলিফা হাফতারের অনুগত বাহিনী ত্রিপোলি দখলের অভিযান চালালে তা প্রতিহত করতে তুরস্ক সহায়তা করেছিল। এরপর থেকে আঙ্কারা ত্রিপোলির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই পূর্ব শিবিরের সঙ্গে সম্পর্ক সম্প্রসারণ করেছে।
ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, সংঘাতের সময়ও ত্রিপোলিতে থাকা তুরস্কের নিরাপত্তা সদস্যরা পূর্ব লিবিয়ার বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগে ছিলেন। তাঁর ভাষায়, “আমাদের নীতিতে আসলে কোনো পরিবর্তন আসেনি; বদলেছে শুধু এর ফলাফল।”
এই কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি চলেছে সামরিক ও গোয়েন্দা পর্যায়ের যোগাযোগও। গত মে মাসে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইয়াসার গুলের খলিফা হাফতারের ছেলে সাদ্দাম হাফতার এবং ত্রিপোলিভিত্তিক সরকারের জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা আবদুসালাম আল-জুবির সঙ্গে বৈঠক করেন।
তুরস্কের গোয়েন্দা প্রধান ইব্রাহিম কালিন গত ২৩ জুন বেনগাজিতে সাদ্দাম হাফতারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। আগস্টে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান খলিফা হাফতার ও সাদ্দাম হাফতার—দুজনের সঙ্গেই বৈঠক করেন।
সামুদ্রিক চুক্তির ভোটের আগে পূর্ব লিবিয়ার পার্লামেন্টের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসে। গত ৬ অক্টোবর আইনপ্রণেতারা স্পিকার আগুইলা সালেহকে সরিয়ে আল-সালহিন আবদেলনাবি আল-ওবেইদিকে স্পিকার করেন; তিনি আগে লিবিয়া-তুরস্ক পার্লামেন্টারি বন্ধুত্ব কমিটির সভাপতি ছিলেন।
চ্যাথাম হাউসের জ্যেষ্ঠ গবেষক গালিপ দালায় আঙ্কারার এই অগ্রগতিকে কৌশলগত লাভ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, “এটি শুধু বাস্তববাদী বা কৌশলগত সাময়িক লাভ নয়; এটি তুরস্কের জন্য একটি কৌশলগত অর্জন।” তাঁর মতে, লিবিয়ার দুই শিবিরের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলে তুরস্ককে বাদ দিয়ে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে জ্বালানি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়া কঠিন হয়ে পড়ে।
হাফতার শিবিরের ভেতরের রাজনৈতিক হিসাবও এই ঘনিষ্ঠতার পেছনে কাজ করছে বলে মনে করেন ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের ভিজিটিং ফেলো তারেক মেগেরিসি। তাঁর ধারণা, সাদ্দাম হাফতার আশা করেন আঙ্কারার প্রভাব তাঁর নিজের রাজনৈতিক সম্ভাবনা শক্ত করবে; অনেকের বিশ্বাস, শেষ পর্যন্ত তিনি লিবিয়ার নেতৃত্বে যেতে চান।
অন্যদিকে সাদেক ইনস্টিটিউটের পরিচালক আনাস এল গোমাতি সতর্ক করেছেন, লিবিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী নেতাদের মধ্যে বোঝাপড়া মানেই অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক সমাধান নয়। তাঁর ভাষায়, “দুই শিবিরের মধ্যে অভিজাত পর্যায়ের একটি চুক্তি তাদের বাইরের সবাইকে বাদ দিয়েও হতে পারে।”
লিবিয়ার দুই শিবিরের প্রতিনিধিরা শুক্রবার আঙ্কারায় সামরিক কাঠামো একীভূত করা নিয়ে আলোচনা করেছেন বলে লিবিয়ার গণমাধ্যম জানিয়েছে। তবে রাজনৈতিক তদারকি নিয়ে মতভেদ অমীমাংসিতই রয়েছে এবং কোনো চূড়ান্ত চুক্তির ঘোষণা আসেনি।
পূর্ব লিবিয়ার পার্লামেন্টের এই অবস্থান-বদল মিসরের অবস্থানকেও জটিল করে তুলেছে। কায়রো ঐতিহ্যগতভাবে পূর্বাঞ্চলীয় নেতৃত্বকে সমর্থন করে এলেও সামুদ্রিক চুক্তিটির বিরোধী; সেই চুক্তিই এখন পূর্ব পার্লামেন্টে অনুমোদন পেয়েছে।
২২ অক্টোবর গ্রিসের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিওর্গোস গেরাপেটরিটিস ২০২০ সালে মিসরের সঙ্গে করা আংশিক সামুদ্রিক সীমানা চুক্তি সাইপ্রাসের দিকে পূর্বে সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনার ঘোষণা দেন। চার দিন পর, ২৬ অক্টোবর জাতিসংঘে এক বিবৃতিতে মিসর, গ্রিস, সাইপ্রাস, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন তুরস্ক-লিবিয়া চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে।
তবু কায়রো ও আঙ্কারার সম্পর্ক পুনর্গঠন থামেনি। তুরস্কের স্থলবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল মেতিন তোকেল সোমবার সরকারি সফরে মিসরে পৌঁছেছেন। তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ৪ থেকে ৯ নভেম্বর আলেকজান্দ্রিয়ায় যৌথ নৌ মহড়ারও ঘোষণা দিয়েছে।
বুধবার তুরস্কের জাতীয় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় কায়রোর সঙ্গে সামুদ্রিক সীমানা চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তাব নতুন করে তুলেছে। আঙ্কারার যুক্তি, গ্রিসের সঙ্গে সম্ভাব্য আরেকটি চুক্তির তুলনায় তুরস্কের সঙ্গে চুক্তি হলে মিসর ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি অতিরিক্ত সামুদ্রিক এখতিয়ার পেতে পারে—এই হিসাব তুরস্কের নিজস্ব অনুমান।
গ্রিস বলে, এই সামুদ্রিক চুক্তিতে ক্রিটসহ তাদের দ্বীপগুলোর অধিকার উপেক্ষা করা হয়েছে। তুরস্ক সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলে, সামুদ্রিক সীমানা ও একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্ধারণে দ্বীপকে মূল ভূখণ্ডের সমান ওজন স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেওয়া উচিত নয়।
মেগেরিসির মতে, পূর্ব লিবিয়ার পার্লামেন্টের অনুমোদন চুক্তিটির অভ্যন্তরীণ আইনি ভিত্তি শক্ত করলেও পূর্ব ভূমধ্যসাগরের দেশগুলোর বৃহত্তর বিবাদের মীমাংসা এতে খুব একটা এগোয় না। তাঁর ভাষায়, এই ভোট আঙ্কারাকে রাজনৈতিক সুবিধা দিলেও প্রতিদ্বন্দ্বী সামুদ্রিক দাবির নিষ্পত্তি বা সমুদ্রগর্ভে জ্বালানি অনুসন্ধানের পথ পরিষ্কার করে না।




