কম্বোডিয়ার স্ক্যাম কম্পাউন্ড পাহারায় পুলিশ-সেনা সদস্যদের অভিযোগ অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে

কম্বোডিয়ায় অনলাইন প্রতারণার স্ক্যাম কম্পাউন্ডগুলোতে বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে দেশটির পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর কর্মরত সদস্যরা কাজ করেছেন বলে অভিযোগ করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কম্পাউন্ডে হাজার হাজার মানুষকে অনলাইন জালিয়াতির কাজে বাধ্য করা হয়েছিল।
অ্যামনেস্টির মহাসচিব আনিয়েস কালামার বলেন, বছরের পর বছর ধরে এসব ভয়াবহ কম্পাউন্ড থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা ভেতরে কম্বোডিয়ার সেনা বা পুলিশ সদস্যদের দেখার কথা বললেও তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি—এবার তা সম্ভব হয়েছে।
প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে ১৫১ জন ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার, ৮২টি স্ক্যাম কম্পাউন্ড পরিদর্শন এবং কোম্পানির পোশাক পরা রক্ষীদের ডজনখানেক সামাজিক মাধ্যমের ভিডিওর ভিত্তিতে। তদন্তে বলা হয়েছে, অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে সুসম্পর্কযুক্ত পাঁচটি বেসরকারি নিরাপত্তা কোম্পানির সংযোগ পাওয়া গেছে।
কালামার বলেন, তাঁদের অনুসন্ধান কম্বোডিয়ার বিলিয়ন ডলারের অপরাধী স্ক্যামিং নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে দীর্ঘদিনের সন্দেহভাজন সংযোগ উন্মোচন করতে শুরু করেছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তা কোম্পানিগুলোর রক্ষীরাই কম্পাউন্ডের বের হওয়ার পথ নিয়ন্ত্রণ করত, পালিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের ধরে আনত এবং ভয় ও সহিংসতার মাধ্যমে নিয়ম মানতে বাধ্য করত; তাদের ছাড়া এই ব্যাপক শোষণের ব্যবস্থা চলতে পারত না।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মানুষকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পাচার করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে অফিসের চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রলুব্ধ করে তাদের বিশ্বজুড়ে মানুষকে লক্ষ্য করে অনলাইন প্রতারণায় বাধ্য করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘পিগ বুচারিং’ নামে পরিচিত প্রণয়-প্রতারণাও রয়েছে, যেখানে অপরাধীরা ভুয়া সম্পর্ক গড়ে ধীরে ধীরে ভুক্তভোগীর আস্থা অর্জন করে পরে তার অর্থ চুরি করে।
অ্যামনেস্টির ‘অফিশিয়াল বিজনেস’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিপ সোমনাং নামের কোম্পানিটির উপস্থিতি সবচেয়ে বড় ছিল এবং এটি আটটি প্রদেশের অন্তত ১৫টি কম্পাউন্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল। ১২ জন ভুক্তভোগী কোম্পানিটির রক্ষী, পোশাক বা লোগো শনাক্ত করেছেন।
অ্যামনেস্টির অভিযোগ, লিপ সোমনাং বান সোফাতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে মনে করা হয়; তিনি প্রকাশ্যে কোম্পানিটির চেয়ার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, একই সঙ্গে তিনি সশস্ত্র বাহিনীর একজন কর্নেল। সংস্থাটি দুটি স্ক্যাম কম্পাউন্ডে লিপ সোমনাং রক্ষীদের পাশে তাঁর ছবি বলে দাবি করা ছবিও দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বান সোফাতের একটি চিঠি উদ্ধৃত করা হয়েছে, যেখানে তিনি লিপ সোমনাংয়ে কোনো মালিকানা, পরিচালক বা ব্যবস্থাপনার ভূমিকা থাকার কথা অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি কোম্পানির মালিকের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেছেন। চিঠিতে তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট স্থানে তোলা ছবিতে তাঁর উপস্থিতির অর্থ এই নয় যে সেখানে পরিচালিত কার্যক্রম সম্পর্কে তিনি জানতেন বা তাতে জড়িত ছিলেন।
স্ক্যাম সাইট থেকে বেঁচে ফেরা ব্যক্তিরা বর্ণনা করেছেন, রক্ষীরা বৈদ্যুতিক শক দিত ও মারধর করত, মানুষকে ‘অন্ধকার কক্ষে’ আটকে রাখত এবং কম্পাউন্ড ব্যবস্থাপকরা নারীদের ধর্ষণ করার সময় পাহারা দিত। অ্যামনেস্টি বলেছে, তারা সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর ২০ জনের বেশি সদস্যকে শনাক্ত করেছে, যাদের কম্পাউন্ডগুলোতে সক্রিয় উপস্থিতি দেখা গেছে, যার মধ্যে প্রকাশ্যে রক্ষী হিসেবে কাজ করাও রয়েছে।
বার্ষিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার বলে অনুমান করা হয়েছে—যা অঞ্চলের কয়েকটি দেশের জিডিপির চেয়ে বেশি। এতে কম্বোডিয়া, লাওস ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক চাপ বেড়েছে। শিল্পটির কিছু অংশ দক্ষিণ এশিয়ায় সরে যাওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে কম্বোডিয়া স্ক্যাম কার্যক্রমের বিরুদ্ধে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় অভিযান শুরু করে এবং অপরাধী নেটওয়ার্ক নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দেয়। কর্তৃপক্ষ শত শত স্ক্যাম কেন্দ্র বন্ধ করার দাবি করেছে এবং অ্যামনেস্টি বলেছে, সেখানে শিল্পটি এখন ‘সুপ্ত’ অবস্থায় রয়েছে।
কালামার বলেন, স্ক্যাম কম্পাউন্ডগুলো সুপ্ত থাকলেও দায়মুক্তির কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়নি—তাঁদের অনুসন্ধানে তা স্পষ্ট। যারা এই নির্যাতনমূলক ব্যবস্থায় কর্মী, ব্যবস্থাপক, অর্থদাতা ও রক্ষক হিসেবে ছিল, তাদের জবাবদিহির আওতায় না আনা পর্যন্ত কম্বোডিয়া এই শিল্পের অবসান ঘটাতে পারবে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অ্যামনেস্টি বলেছে, তারা অনুসন্ধানের ফল কম্বোডিয়া কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জবাবে বলা হয়েছে, চলমান অভিযানের অংশ হিসেবে তারা ইতিমধ্যে ৭৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে শাস্তি দিয়েছে, অবৈধভাবে স্টান ব্যাটন ব্যবহারের দায়ে ছয়জন বেসরকারি নিরাপত্তারক্ষীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে এবং অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশের দায়ে সামরিক, পুলিশ ও বেসামরিক ১৭ জন কর্মকর্তাকে আটক করেছে। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, কর্তৃপক্ষ ৩ হাজার ৪৭৭ জন সন্দেহভাজনকে আদালতে পাঠিয়েছে। অ্যামনেস্টি বলেছে, লিপ সোমনাংয়ের কাছ থেকে তারা কোনো জবাব পায়নি।




