কিশোর গ্যাং দমনে দেশজুড়ে সমন্বিত অভিযানের ছক পুলিশের, তালিকায় নেতা ও পৃষ্ঠপোষকেরাও
কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই ও মাদকসংক্রান্ত অপরাধ রুখে দিতে দেশজুড়ে সমন্বিত অভিযানের ছক কষছে পুলিশ। শুধু গ্যাংয়ের সদস্য নয়, তাদের সংগঠক, অর্থের জোগানদাতা ও অপরাধে সহায়তাকারীদেরও শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ জন্য পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটকে সক্রিয় গ্যাং, সদস্য ও পৃষ্ঠপোষকদের তালিকা তৈরি এবং হালনাগাদ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী সময়ে সমন্বিত অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মো. সায়েদুর রহমান জানিয়েছেন, সক্রিয় কিশোর গ্যাং এবং তাদের সংগঠক ও পৃষ্ঠপোষকদের তথ্য সংগ্রহে পুলিশের সব ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তালিকা পাওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোতে অভিযান পরিচালনার বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
তিনি বলেন, যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের কোনো রেকর্ড নেই, তাদের শুধু সন্দেহের ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা নেই। জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে এবং আইন ভাঙছে, এমন ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই উদ্যোগের আওতায় স্পেশাল ব্রাঞ্চ, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) প্রাথমিক যাচাইয়ে ১ হাজার ৩৩৩টি কিশোর গ্যাং, ২১৩ জন দলনেতা বা সংগঠক এবং ২৭ জন পৃষ্ঠপোষকের একটি খসড়া তালিকা তৈরির তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ সদরদপ্তরে পাঠানোর আগে তালিকাটি বিভাগীয় পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এই উদ্যোগের মধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় ইতিমধ্যে কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান জোরদার হয়েছে। কুমিল্লায় ২৩ সেপ্টেম্বর থেকে জেলা পুলিশের ১৮টি থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের সমন্বয়ে বিশেষ অভিযান শুরু হয়। প্রথম পাঁচ দফার অভিযানে ২ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করার তথ্য প্রকাশ করে পুলিশ। ২ অক্টোবরের অভিযানে আটক ৩৭০ জনের মধ্যে ২৭৯ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়; বাকিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যাচাই করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়। পরবর্তী অভিযানেও সেখানে শত শত মানুষকে আটক করা হয়েছে; ৯ অক্টোবর এক রাতের অভিযানে আরও ২৫২ জনকে আটক করার তথ্য প্রকাশিত হয়।
নোয়াখালীতে ১২ অক্টোবর সকাল পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার অভিযানে জেলার নয়টি থানা এলাকা থেকে ১৪৫ জনকে আটক করে পুলিশ। একই সময়ে লক্ষ্মীপুরের ছয় থানায় তিন দিনের ধারাবাহিক অভিযানে মোট ৫৪৭ জনকে আটক করার তথ্য প্রকাশিত হয়। এসব অভিযানে আটকদের পরিচয়, বয়স ও অপরাধে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট পুলিশ।
তবে এসব অভিযানে আটক হওয়া প্রত্যেক ব্যক্তি কিশোর গ্যাংয়ের সদস্য বা অপরাধে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। পুলিশও যাচাই-বাছাইয়ের পর অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে।
কিশোর গ্যাংয়ের প্রকৃত সংখ্যা ও সদস্যদের বিষয়ে পুলিশের তথ্যভাণ্ডারে অসংগতি রয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের আগের তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে ৩০৭টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য ছিল—এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় ৯৩টি, ঢাকা রেঞ্জে ৭৮টি, চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৫৪টি এবং ডিএমপির তালিকায় ছিল ৪১টি গ্যাং। বিভিন্ন ইউনিট নিজেদের মতো করে তালিকা তৈরি করায় সংখ্যার এই পার্থক্য থেকেই যেতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন; ফলে দেশব্যাপী একটি সমন্বিত ও নিয়মিত হালনাগাদ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের আগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে ৪৮টি গ্যাংয়ের ২৭০ সদস্য ৬৯টি ফৌজদারি মামলার মুখোমুখি হয়েছিল। এর মধ্যে ২১টি মামলা ছিল গ্যাংগুলোর নিজেদের মধ্যে সংঘাতের ঘটনায়। ওই ৪৮টি গ্যাংয়ের তালিকাভুক্ত সদস্যসংখ্যা ছিল ৫৭৭।
কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে পুলিশ। অতিরিক্ত আইজিপি সায়েদুর রহমানের ভাষ্য, কিশোর অপরাধ দমনে কঠোর হওয়া প্রয়োজন, তবে তা নিষ্ঠুরতার পর্যায়ে যাওয়া উচিত নয়। বিশেষ ক্ষমতা আইনে কিশোরদের গ্রেপ্তার করার মতো পদক্ষেপ ভালো চর্চা হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। পুলিশের অনুসন্ধানে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা অন্য কোনো মহল গ্যাংগুলোকে অর্থ, আশ্রয় কিংবা সুরক্ষা দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।



