সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা তাহসিন সাওরের মৃত্যু: তাড়াহুড়া করে ‘হত্যা’ না বলতে সতর্ক করলেন মেজর (অব.) নাসির, চাইলেন সমন্বিত তদন্ত

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা তাহসিন সাওরের মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় সব দিক বিবেচনায় নিয়ে ধারাবাহিক ও সমন্বিত তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন মেজর (অব.) ড. নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ। তিনি বলেছেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত না হয়ে ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড হিসেবে উল্লেখ করা ঠিক হবে না।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) এ বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে নিজের মতামত তুলে ধরেন তিনি। আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা কিংবা অপরাধমূলক মৃত্যুর সম্ভাবনাসহ সব দিক খতিয়ে দেখা জরুরি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে নৌ-পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, তাহসিন সাওরের শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি।
মেজর নাসির বলেন, ইউনিফর্মধারী কোনো ব্যক্তি কর্মরত কিংবা অবসরপ্রাপ্ত—যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, তার মৃত্যু সবার জন্যই কষ্টের। তবে এ ধরনের মৃত্যু আরও বেশি চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে যথাযথ তদন্তের বিকল্প নেই।
নিরাপত্তাবিষয়ক অধ্যয়ন ও অপরাধ বিশ্লেষণের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সাধারণভাবে মৃত্যুকে স্বাভাবিক, আত্মহত্যাজনিত ও অস্বাভাবিক—এই তিন ভাগে বিবেচনা করা যায়।
তাঁর ভাষায়, স্বাভাবিক মৃত্যুর আড়ালে কোনো অপরাধ লুকিয়ে আছে কি না, আত্মহত্যার পেছনে ব্যক্তিগত সংকটের পাশাপাশি কারও চাপ বা নিপীড়ন ছিল কি না এবং অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, অবহেলা কিংবা অপরাধের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তাহসিন সাওরের মৃত্যুর বিষয়ে মেজর নাসির বলেন, এখনই ঘটনাটিকে হত্যাকাণ্ড না বলে আলোচিত মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করাই যুক্তিযুক্ত। কারণ, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে হলে তদন্তের মাধ্যমে তথ্য-প্রমাণ যাচাই করতে হবে।
তিনি বলেন, এ ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন আলোচনা ও তথ্য সামনে এসেছে। এসব তথ্যের সত্যতা যাচাই করে অনুসন্ধান এগিয়ে নেওয়া দরকার।
বিশেষ করে পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় কোনো অভিযোগ বা তথ্য দেওয়া হয়েছে কি না, তাঁর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে কোনো সংকট ছিল কি না এবং মৃত্যুর আগে তিনি কোনো ধরনের চাপের মুখে ছিলেন কি না, সেসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
মেজর নাসিরের মতে, সংশ্লিষ্ট কল রেকর্ডসহ প্রাসঙ্গিক তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে পুলিশ তাঁর মৃত্যুর আগে কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না, সে সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে পারে। তবে কোনো একটি তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে না পৌঁছে সব তথ্য মিলিয়ে দেখতে হবে।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের একটি ভিডিও ফুটেজ তাহসিন সাওর ধারণ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সে প্রসঙ্গে মেজর নাসির বলেন, তাঁকে ঘিরে আলোচনায় থাকা ভিডিও ফুটেজের সত্যতা যাচাইয়ের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে। ফুটেজটি কতটুকু সত্য, কীভাবে এটি প্রকাশ্যে এসেছে এবং এর পেছনে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।
ফুটেজটির সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও অনুসন্ধানের বিষয় বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, ভিডিওটি প্রকাশের কারণে তাহসিন সাওর কোনো ধরনের চাপের মুখে পড়েছিলেন কি না, কিংবা কোনো সরকারি-বেসরকারি পক্ষ, গোয়েন্দা সংস্থা, বিদেশি পক্ষ বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে এ ঘটনার কোনো যোগসূত্র ছিল কি না, তা প্রমাণের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখা উচিত।
তবে এসব সম্ভাবনাকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা না করে তদন্তের বিষয় হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। ভিডিও ফুটেজটি প্রকাশের ফলে কোনো পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কি না, কিংবা কেউ এতে উদ্বিগ্ন বা ক্ষুব্ধ হয়েছিল কি না, তাও অনুসন্ধান করা দরকার বলে তিনি বলেন।
তাহসিন সাওরের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে তাঁর পরিবার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান মেজর নাসির। তাঁর মতে, সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা হওয়ায় এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট সামরিক নিরাপত্তা ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোরও ভূমিকা থাকতে পারে।
তিনি বলেন, তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা বা পক্ষের বক্তব্যে যেন পরস্পরবিরোধিতা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি। এ ক্ষেত্রে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) যাচাই করা তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে পারে।
মেজর নাসিরের মতে, সমন্বিত ও কার্যকর তদন্ত হলে অপতথ্য, অপপ্রচার এবং মনগড়া ব্যাখ্যা ছড়ানোর সুযোগ কমবে। একই সঙ্গে তদন্তের স্বার্থে তথ্য যাচাই করে প্রকাশ করা হলে জনমনে তৈরি হওয়া বিভিন্ন প্রশ্নেরও উত্তর পাওয়া সম্ভব হবে।
তাহসিন সাওরের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর পরিবারের সদস্যদের প্রতি সংবেদনশীল আচরণের আহ্বান জানিয়ে মেজর নাসির বলেন, মৃত্যু পরিবারের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ও স্পর্শকাতর বিষয়। তাই তাদের যেন অযথা অপদস্থ করা না হয় কিংবা অসম্মানজনক আচরণের শিকার হতে না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।
তিনি বলেন, মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে অনুমাননির্ভর বক্তব্য না দিয়ে তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি।




