সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু তিন দিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন, এসেছেন ১২ দেশের ৩৫০ বিজ্ঞানী-গবেষক

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিকৃবি) শুরু হয়েছে বাংলাদেশ সোসাইটি অব প্লান্ট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (বিএসপিএসটি) পঞ্চম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। টেকসই কৃষির উন্নয়ন, উদ্ভিদবিজ্ঞানের অগ্রগতি এবং কৃষি প্রযুক্তির নতুন উদ্ভাবন নিয়ে এই সম্মেলনে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১২টি দেশের প্রায় ৩৫০ জন বিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ ও পেশাজীবী অংশ নিচ্ছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৯টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় অডিটোরিয়ামে ‘টেকসই কৃষির জন্য প্লান্ট সায়েন্স ও প্রযুক্তি: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ’ প্রতিপাদ্যে সম্মেলনের উদ্বোধন করা হয়। বিএসপিএসটি ও সিকৃবির কৃষি অনুষদের যৌথ আয়োজনে সম্মেলনটি চলবে ২৯ থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত, মোট তিন দিন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিএসপিএসটির সভাপতি ও গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ বোটানি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল বাসেত মিয়া। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. মাসুমা হাবিব। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে অধ্যাপক ড. মাসুমা হাবিব বলেন, ‘টেকসই কৃষি মানে শুধু বেশি উৎপাদন করা নয়, বরং আরও ভালোভাবে উৎপাদন করা। এর অর্থ হলো এমন ফসল উৎপাদন করা, যা খরা, লবণাক্ততা এবং বন্যা সহ্য করতে পারে। আর এই সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে উদ্ভিদবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি; বীজ থেকে মাঠে, গবেষণাগার থেকে কৃষকের কাছে—বিজ্ঞানকেই পথ দেখাতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে জাতটি কেবল গবেষণাগারেই থেকে যায়, তা কারও মুখে অন্ন জোগায় না।’ বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সেতুবন্ধন আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে তিনি তরুণ গবেষক ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, তাঁরা কেবল অংশগ্রহণকারী নন, তাঁরাই বাংলাদেশে উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ; গবেষণার শেষে থাকা কৃষকের কথা যেন তাঁরা কখনো না ভোলেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বক্তব্য দেন সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সফি উল্যাহ মজুমদার। তিনি বলেন, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে টেকসই কৃষি ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিষয়ক পঞ্চম আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করতে পারা অত্যন্ত গর্বের বিষয়। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশগত অবক্ষয় ও খাদ্যনিরাপত্তার বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই সম্মেলন জ্ঞান বিনিময় এবং নতুন প্রযুক্তি অন্বেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে হবিগঞ্জ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. মোজাম্মেল হক বলেন, আজকের কৃষি অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি; প্রাকৃতিক সম্পদ হ্রাস, খাদ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং বিভিন্ন পরিবেশগত চাপ বিশ্বব্যাপী কৃষি উৎপাদনের স্থায়িত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্ভাবনী ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি সায়েন্স মালয়েশিয়ার স্কুল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেসের ডিন ড. আমির হামজাহ আহমদ গাজালি। স্বাগত বক্তব্য দেন বিএসপিএসটির সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রপ বোটানি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আলমগীর হোসেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সিকৃবির কৃষি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম।
আয়োজকেরা জানান, সম্মেলনের ২০টি কারিগরি অধিবেশনে মৌখিক, পোস্টার ও ভার্চুয়াল মাধ্যমে মোট ২৬৫টি বৈজ্ঞানিক গবেষণাপত্র উপস্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব অধিবেশনে গবেষণার ফলাফল বিনিময়ের পাশাপাশি আমন্ত্রিত বক্তাদের বক্তব্য ও বৈজ্ঞানিক আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। সম্মেলনে খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারে প্লান্ট সায়েন্সের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
২০২০ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএসপিএসটি উদ্ভিদবিষয়ক গবেষণার অগ্রগতি, একাডেমিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের প্রসারে কাজ করছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে প্লান্ট সায়েন্সের উন্নয়নেও ভূমিকা রাখছে সংগঠনটি; এরই ধারাবাহিকতায় পঞ্চম আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছে।
বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষকে উৎসাহিত করতে সম্মেলনে উপস্থাপিত গবেষণাপত্রগুলোর মৌখিক ও পোস্টার উপস্থাপনা নির্ধারিত মূল্যায়ন মানদণ্ড অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হবে। সমাপনী অধিবেশনে বিভিন্ন কারিগরি অধিবেশনের সেরা উপস্থাপকদের ‘বেস্ট প্রেজেন্টার অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হবে। এ ছাড়া প্লান্ট সায়েন্স ও প্রযুক্তির অগ্রগতিতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিএসপিএসটির ছয়জন বিশিষ্ট সদস্যকে দুটি বিভাগে সম্মাননা দেওয়া হবে—‘ইন রিকগনিশন অব আউটস্ট্যান্ডিং ডেডিকেটেড সার্ভিস’ এবং ‘সেলিব্রেটিং এক্সেলেন্স ইন সার্ভিস’।
বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমের পাশাপাশি সম্মেলনের তৃতীয় দিন, ৩১ অক্টোবর, দেশি-বিদেশি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে সিলেটের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। আয়োজকদের প্রত্যাশা, এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন প্লান্ট সায়েন্স ও কৃষিবিষয়ক গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং টেকসই কৃষির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্ভাবনী ও কার্যকর সমাধান বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।




