ইরান যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের খরচ অন্তত ৪ হাজার ৭১০ কোটি ডলার: পেন্টাগন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন আইনপ্রণেতাদের জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের এ পর্যন্ত খরচ হয়েছে অন্তত ৪ হাজার ৭১০ কোটি ডলার (৪৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার)।
গত সপ্তাহে প্রকাশিত এই হিসাব এসেছে ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে। এই নির্বাচনেই নির্ধারিত হবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি আগামী দুই বছরের জন্য কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে কি না।
পেন্টাগন কংগ্রেসকে জানিয়েছে, ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধের খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে অন্তত ৪ হাজার ৭১০ কোটি ডলারে। কংগ্রেস কর্মকর্তারা পেন্টাগনের খরচের এই বিভাজন নিউ ইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন।
টাইমস ও অন্যান্য মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পেন্টাগনের হিসাবে যুদ্ধের পরিচালন খরচের পাশাপাশি বোমা, গুলি ও অন্যান্য ব্যবহৃত সামরিক সরঞ্জাম প্রতিস্থাপনের জন্য আনুমানিক ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার খরচ ধরা হয়েছে।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মার্কিন বিমানবাহিনী যুদ্ধবিমান ও বোমারু ইউনিটে ব্যয় করেছে ৭৬০ কোটি ডলার; মার্কিন নৌবাহিনী দুই ডজন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানবাহী রণতরীতে ব্যয় করেছে ১৫০ কোটি ডলার; আর মধ্যপ্রাচ্যে সেনা মোতায়েন ধরে রাখতে মার্কিন সেনাবাহিনী ব্যয় করেছে ২১০ কোটি ডলার।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের হিসাবে, মধ্যপ্রাচ্যে বড় স্থায়ী ঘাঁটি ও ছোট অগ্রবর্তী স্থাপনা মিলিয়ে ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে।
কর্মকর্তারা টাইমসকে জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত বিমান ও গোলাবারুদ প্রতিস্থাপনে পেন্টাগন ব্যয় করেছে ৬১০ কোটি ডলার, অঞ্চলে কমান্ডোদের পরিবহন ও সহায়তায় ৬৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার এবং মার্কিন সেনাদের অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা সহায়তায় ২ কোটি ৪৫ লাখ ডলার।
একজন কংগ্রেস কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, সরঞ্জাম স্থানান্তরে মার্কিন ট্রান্সপোর্টেশন কমান্ড ব্যয় করেছে ৯ কোটি ২২ লাখ ডলার এবং ‘সাইবার সহায়তা অভিযানে’ সাইবার কমান্ড ব্যয় করেছে ১ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
তবে পেন্টাগনের এই হিসাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি মেরামতে ওয়াশিংটনের কত খরচ হবে তা ধরা হয়নি; জাহাজ ও বিমান চালানোর জ্বালানির খরচও এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
পেন্টাগন প্রকাশ্যে ১৮ জন মার্কিন সেনার মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে, তবে ওয়াশিংটন পোস্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছয় মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানিয়েছে, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা অন্তত ২২। পেন্টাগনের ডিফেন্স ক্যাজুয়ালটি অ্যানালাইসিস সিস্টেম (ডিসিএএস) ডাটাবেস অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ৮৬৫ জন সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন।
ইউএসএ টুডের ১৯ অক্টোবরের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পাঁচজন সিনেটর সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারকে চিঠি দিয়ে যুদ্ধের প্রকৃত খরচ প্রকাশের দাবি জানিয়েছিলেন। চিঠিতে তাঁরা বলেছিলেন, যুদ্ধের প্রকৃত খরচ লুকানোর ট্রাম্প প্রশাসনের ‘অব্যাহত প্রচেষ্টা’ হতবুদ্ধিকর ও অগ্রহণযোগ্য।
সিনেটের সংখ্যালঘু দলের নেতা চাক শুমার পেন্টাগনের সর্বশেষ প্রতিবেদনের পর এক্সে লিখেছেন, ‘আট মাস ধরে আমেরিকান পরিবারগুলো ট্রাম্পের বিপর্যয়কর ইরান যুদ্ধের ভারী খরচের নিচে চাপা পড়ে আছে।’ তিনি আরও লিখেছেন, ‘ট্রাম্প ও তাঁর অহংকার আমাদের এই যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছে — কোনো পরিকল্পনা ছাড়া, কোনো কর্তৃত্ব ছাড়া, কোনো বেরিয়ে আসার কৌশল ছাড়া।’
খরচের হিসাব ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। পেন্টাগনের সর্বশেষ হিসাব কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসের (সিবিও) সেপ্টেম্বরের ৩ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জুলাইয়ে ৩ হাজার ৭৫০ কোটি ডলারের কথা বলেছিলেন, যা ছিল মে মাসের ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলারের হিসাবের চেয়ে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার বেশি; এপ্রিলের শেষে পেন্টাগনের কম্পট্রোলার জুলস হার্স্ট খরচ ধরেছিলেন ২ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।
যুদ্ধ নবম মাসে ঢুকেছে এবং শান্তি চুক্তির কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। গত মাসে সিবিও বলেছিল, যুদ্ধ চলতে থাকলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে প্রতি মাসে আনুমানিক ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলার খরচ হতে পারে।
জ্বালানির দামেও যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে। আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, বুধবার যুক্তরাষ্ট্রে এক গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ছিল ৬ দশমিক ৩৫ ডলার, যেখানে গত বছর তা ছিল ৩ দশমিক ৭৫ ডলার। দেশটির জাতীয় ঋণও প্রত্যাশার দুই বছর আগেই রেকর্ড ৪০ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
জরিপের হিসাবে ট্রাম্পের জনসমর্থন নেমে এসেছে ৩৩ শতাংশে, যা তাঁর দুই মেয়াদের যেকোনো সময়ের সর্বনিম্ন। রিয়েলক্লিয়ারপোলিংয়ের জাতীয় জরিপ গড় অনুযায়ী, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে ডেমোক্র্যাটরা ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ বনাম ৪৩ দশমিক ২ শতাংশে রিপাবলিকানদের চেয়ে ৮ দশমিক ২ পয়েন্টে এগিয়ে আছে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ক্রিস ফেদারস্টোন আল জাজিরাকে বলেছেন, এই ইস্যুটি ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যের দুটি মূল ভিত্তিকে আঘাত করে — ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনি প্রচারে তাঁর ‘নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু না করার’ প্রতিশ্রুতি এবং আমেরিকান অর্থনীতি ঠিক করার ওপর তাঁর জোর।




