চীনের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে রেকর্ড ৩৩ সদস্য বহিষ্কার, পঞ্চম প্লেনামে সবচেয়ে বেশি আসন ফাঁকা

চীনের কমিউনিস্ট পার্টি থেকে রেকর্ড ৩৩ জন সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়েছে। দলের একটি বড় বার্ষিক রাজনৈতিক সমাবেশ শেষে এই সিদ্ধান্ত জানানো হয়, আর ওই সমাবেশেই দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি খালি আসন।
পঞ্চম প্লেনামে কেন্দ্রীয় কমিটির ২৭৯ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে চতুর্থ প্লেনামে উপস্থিত ছিলেন ৩১৫ জন এবং ২০২৪ সালের জুলাইয়ে তৃতীয় প্লেনামে ছিলেন ৩৬৪ জন। শি জিনপিংয়ের ১৪ বছরের নেতৃত্বে এই প্রথম কোনো প্লেনামে উপস্থিতি ৩০০-এর নিচে নামল। বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটি ২০২২ সালে ৩৭০ জনের বেশি সদস্য নিয়ে মেয়াদ শুরু করেছিল।
সাম্প্রতিক প্লেনামগুলোতে অর্থনৈতিক সংস্কার কিংবা সামাজিক ও উন্নয়নমূলক বিষয় প্রাধান্য পেলেও এই সপ্তাহের সমাবেশে কেন্দ্রে ছিল দলীয় শৃঙ্খলা। ২০১২ সালে ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে শি তাঁর শাসনের কেন্দ্রীয় স্তম্ভ বানিয়েছেন এবং দুর্নীতিকে তিনি দলের জন্য ‘সবচেয়ে বড় হুমকি’ বলে বর্ণনা করেছেন।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ইশতেহার অনুযায়ী, বহিষ্কৃত ৩৩ জনের মধ্যে ১৬ জনই সামরিক বাহিনীর সদস্য। চার দিনের এই রুদ্ধদ্বার সমাবেশ বেইজিংয়ের একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। বহিষ্কৃতদের বিরুদ্ধে ‘গুরুতর শৃঙ্খলা ও আইন লঙ্ঘন’ ছাড়া সুনির্দিষ্ট আর কোনো অভিযোগের কথা জানা যায়নি; শির দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে এ ধরনের বিস্তৃত অভিযোগ এখন নিয়মিত হয়ে উঠেছে।
এই বহিষ্কারের পর শির তৃতীয় মেয়াদে অপসারিত সদস্যের মোট সংখ্যা দাঁড়াল রেকর্ড ৫১ জনে। তাঁর প্রথম মেয়াদে এই সংখ্যা ছিল ৩৫ এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ছিল পাঁচ। এদিকে দলের শীর্ষ দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা জানিয়েছে, এই বছরের প্রথম নয় মাসে দলীয় কাঠামোজুড়ে ৬ লাখ ৮০ হাজার জনকে শৃঙ্খলামূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
বহিষ্কৃতদের মধ্যে রয়েছেন সিনজিয়াংয়ের সাবেক দলীয় প্রধান মা শিংরুই এবং সাবেক শীর্ষ জেনারেল ঝাং ইউশিয়া ও লিউ ঝেনলি। ঝাং ইউশিয়া কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যানও ছিলেন; সশস্ত্র বাহিনী নিয়ন্ত্রণকারী সাত সদস্যের ওই কমিশন এখন মাত্র দুই সদস্যে নেমে এসেছে—চেয়ারম্যান হিসেবে শি এবং ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে ঝাং শেংমিন।
মা শিংরুই ও ঝাং ইউশিয়া ছিলেন পলিটব্যুরোর সাবেক সদস্য। তাঁদের অপসারণ এবং ২০২৫ সালে সাবেক জেনারেল হে ওয়েইদংয়ের অপসারণের পর ২৪ সদস্যের শক্তিশালী পলিটব্যুরো এক পর্যায়ে ২১ সদস্যে নেমে গিয়েছিল। পঞ্চম প্লেনামে ঝাং শেংমিনকে শীর্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থায় উন্নীত করায় সদস্য সংখ্যা এখন ২২ হয়েছে।
বহিষ্কৃতদের তালিকায় আছেন বিশিষ্ট সাবেক কূটনীতিক লিউ জিয়ানচাও-ও, যিনি গত বছরের জুলাই থেকে জনসমক্ষে ছিলেন না। এই বছর তাঁদের অপসারণের ঘোষণা দেওয়া সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, তাঁরা দলের ‘শৃঙ্খলা ও নিয়ম গুরুতরভাবে লঙ্ঘন’ করেছেন, যা ব্যাপকভাবে দুর্নীতির ইঙ্গিত হিসেবে পড়া হয়।
কার্নেগি চায়নার অনাবাসী পণ্ডিত চং জা ইয়ান বলেন, দুর্নীতিবিরোধী অভিযান এখন ‘কর্তৃত্ব সুসংহত ও বজায় রাখার একটি প্রচেষ্টায়’ পরিণত হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘শি নিজেকে যতটা নিরাপদ মনে করবেন, তার ওপর নির্ভর করেই এই অভিযান চলবে ও বিস্তৃত হবে—আসল দুর্নীতির বিষয়ের ওপর নয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘শি নিজে যাদের পদোন্নতি দিয়েছেন, তাদের সরাতে তাঁর দ্বিধা কম; কোনো বিরোধিতা ছাড়াই ইচ্ছামতো তা করতে পারা দেখায়, এই মুহূর্তে তাঁর অবস্থান কতটা অপ্রতিদ্বন্দ্বী।’
এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের নিল থমাস, লবসাং সেরিং ও শেংইউ ওয়াং সামরিক বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের এই ছাঁটাইকে ‘নিজস্ব একটি শ্রেণিতে’ রয়েছে বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁদের মতে, চীন যখন ভয়ংকর নতুন সামরিক সরঞ্জাম উন্মোচন করে চলেছে, তখনই এই ছাঁটাই ‘সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও যুদ্ধ-প্রস্তুতি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে’।
পর্যবেক্ষকদের মতে, শি দুর্নীতিকে শুধু ঘুষ হিসেবে নয়, মতাদর্শগত অপবিত্রতা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে আনুগত্যহীনতা হিসেবেও দেখেন। জানুয়ারিতে তিনি ‘দ্বিমুখী ক্যাডারদের’ বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন—যারা রাজনৈতিক আনুগত্যের কথা বলেন, কিন্তু আদেশ অমান্য করেন এবং নিজের স্বার্থে কাজ করেন। দলের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, দল ‘কঠোরভাবে স্বীকার করেছে যে একসময় দলীয় নেতৃত্ব দুর্বল বা ফাঁপা হয়ে গিয়েছিল’ এবং ‘ছুরি ভেতরের দিকে ঘুরিয়ে’ কঠোর দলীয় স্ব-শাসন প্রয়োগ অব্যাহত রাখবে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, শৃঙ্খলা—যাকে অনেকে আনুগত্য হিসেবে ব্যাখ্যা করেন—তার ওপর জোর বাড়ার একটি কারণ আগামী বছরের পার্টি কংগ্রেস, যেখানে কমিউনিস্ট পার্টি তার পরবর্তী নেতার জন্য আবার ভোট দেবে। ২০২৭ সালে নেতৃত্বে রদবদল হওয়ার কথা এবং অনেক বিশ্লেষক আশা করছেন শি চতুর্থ মেয়াদ ও তার পরেও শীর্ষ পদে থাকবেন। কমিউনিস্ট চীনের প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুং ছাড়া আর কোনো নেতা এতদিন দায়িত্বে থাকেননি।




