৯৩.৮ শতাংশ ভোট গণনায়ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে দূরে নেতানিয়াহু, আরব দলগুলোর আসন বেড়ে ১৯

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ক্ষমতাসীন জোট সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে অনেকটাই দূরে রয়েছে। বৃহস্পতিবার নতুন করে গণনা করা ব্যালটে আরব দলগুলোর প্রতি সমর্থনের বড় উত্থান দেখা গেছে, যা বিরোধী শিবিরকে পার্লামেন্টে নেতানিয়াহুর নিয়ন্ত্রণকে চ্যালেঞ্জ করার মতো আসন দিতে পারে।
বৃহস্পতিবার ভোর ৪টা পর্যন্ত (ইসরায়েলের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা) ডাবল-এনভেলপ গণনাসহ ৯৩.৮ শতাংশ ব্যালট গণনা শেষে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় ব্লকের প্রাপ্তি দাঁড়িয়েছে ১২০ আসনের নেসেটে ৫৩ আসন। সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী ব্লকের আসন ৪৮। দুটি প্রধানত আরব দলের মিলিত আসন ১৯, যা নেতানিয়াহু-বিরোধী সম্ভাব্য সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে ৬৭ আসনে নিয়ে যায়।
হালনাগাদ হিসাবে নেতানিয়াহুর লিকুদ সবচেয়ে বড় একক দল হিসেবে ২৬ আসন পেয়েছে। এরপর আইজেনকোটের ইয়াশার ২১ আসন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের বেয়াচাদ ১২ আসন পেয়েছে। এসব সংখ্যা এখনো প্রাথমিক।
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১ আসন। নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকোট—কেউই সেই সংখ্যায় পৌঁছাতে পারেননি। ফলে কঠিন জোট আলোচনা কিংবা আরেকটি নির্বাচনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে ইসরায়েলের আরব ভোটারদের কাছ থেকে। আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় তাঁদের ভোটদান নাটকীয়ভাবে বেড়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে দিতে পারে।
ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের হিসাবে আরব ভোটারদের অংশগ্রহণ পৌঁছেছে প্রায় ৮০ শতাংশে, যেখানে ২০২২ সালের নির্বাচনে তা ছিল ৫৩.২ শতাংশ। ২০২৬ সালের এই সংখ্যাটিও এখনো প্রাথমিক।
জয়েন্ট লিস্টের আসন ধরা হয়েছে ১১ এবং রা'আমের আট। দুটি দলের মিলিত ১৯ আসন ২০২২ সালে আরব দলগুলোর পাওয়া ১০ আসনের প্রায় দ্বিগুণ।
ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির হিসাবে নির্বাচনের রাতে রাত ১০টায় আনুষ্ঠানিকভাবে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার সময় পর্যন্ত মোট ভোটদান পৌঁছেছে ৭৭.৭ শতাংশে, যা ওই সময়ের হিসাবে ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ।
আরব ভোটারদের বর্ধিত অংশগ্রহণ পরবর্তী সরকারের গঠন নির্ধারণে নির্ণায়ক হতে পারে। আইজেনকোটসহ কয়েকজন বিরোধী নেতা প্রচারের সময় আরব দলগুলোকে তাঁদের ক্ষমতাসীন জোটে নেওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করলেও আরব দলগুলোর সংসদীয় সমর্থন বিরোধীদের নেতানিয়াহুর মিত্র ও বর্তমান স্পিকার আমির ওহানাকে সরাতে এবং নতুন সরকার গঠনের আগেই আইন প্রণয়নের এজেন্ডার ওপর বেশি নিয়ন্ত্রণ পেতে সাহায্য করতে পারে।
এর মধ্যে বৃহস্পতিবার চ্যানেল ১২-এর এক প্রতিবেদনে অভিযোগ উঠেছে, আরব সম্প্রদায়ের মধ্যে ভোটারদের অংশগ্রহণে প্রভাব ফেলতে কাতার থেকে আসা বড় অঙ্কের অর্থ স্থানান্তর হয়ে থাকতে পারে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই অর্থের কিছু অংশ আগে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোতে অর্থ পাঠাতে ব্যবহৃত আর্থিক চ্যানেল, যার মধ্যে মুদ্রা বিনিময় প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, সেগুলো দিয়ে গেছে বলে অভিযোগ।
অভিযোগগুলো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং বিদেশি অর্থায়ন ঘটেছে কি না কিংবা নির্বাচনসংক্রান্ত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে কি না, তা তদন্তকারীরা এখনো নিশ্চিত করেননি। চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, শিন বেত পরিচালক ডেভিড জিনি সন্দেহভাজন বিদেশি হস্তক্ষেপসংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির চেয়ারম্যান বিচারপতি নোয়াম সোহলবার্গের কাছে উপস্থাপন করেছেন, যার পর বিচারপতি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
এন১২-এর প্রকাশিত চিঠিতে সোহলবার্গ অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থাকে অভিযোগগুলো তদন্ত করে সেগুলো প্রমাণ বা খণ্ডন করতে পারে এমন প্রমাণ শনাক্ত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। গণনার সীমিত সময়ের কথা উল্লেখ করে তিনি এক সপ্তাহের মধ্যে ফলাফল চেয়েছেন। বিচারপতির চিঠিতে সন্দেহভাজন বিদেশি পক্ষ হিসেবে কাতারের নাম প্রকাশ্যে উল্লেখ করা হয়নি; সেই শনাক্তকরণ এসেছে এন১২-এর প্রতিবেদন থেকে।
কাতার বৃহস্পতিবার অভিযোগগুলো কঠোরভাবে অস্বীকার করেছে এবং ইসরায়েলি রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে নির্বাচনের পর উপসাগরীয় দেশটিকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কে টেনে আনার অভিযোগ করেছে। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ড. মাজেদ আল-আনসারি এক্সে লিখেছেন, কাতার ইসরায়েলি নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে কিংবা এর ফলাফলে প্রভাব ফেলতে কোনো কার্যক্রমে অর্থ দিয়েছে—এমন অভিযোগ তাঁরা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেন।
আল-আনসারি ইসরায়েলি রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমে তাঁদের মিত্রদের বিরুদ্ধে ‘বিভ্রান্তিমূলক প্রচার’ চালানোর অভিযোগ করে বলেন, কাতারের বিরুদ্ধে কখনো নেতানিয়াহুকে, কখনো ইসরায়েলি বামপন্থীদের, আবার কখনো আরব ভোটারদের অর্থ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, কাতারকে নির্দিষ্ট কিছু ইসরায়েলি রাজনীতিবিদের রাজনৈতিক ব্যর্থতার বলির পাঁঠা হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইসরায়েলের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কাতারের কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনেও কমিটিতে থাকা ইয়েশ আতিদের সংসদ সদস্য ভ্লাদিমির বেলিয়াককে লেখা চিঠিতে অভিযোগগুলো প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, নেসেট নির্বাচন আইন অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হয়েছে, ভোটকেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনের অখণ্ডতা কঠোরভাবে রক্ষা করা হয়েছে এবং তাঁদের জানামতে নির্বাচনের অখণ্ডতা পদ্ধতিগতভাবে লঙ্ঘনের অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।




