জাপানে যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা গড়তে যুক্তরাষ্ট্র-জাপান চুক্তি, লক্ষ্য এএমআরএএএম

যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান জাপানে একটি কারখানা স্থাপন করে যৌথভাবে উন্নত মাঝারি পাল্লার আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে সম্মত হয়েছে। জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এই ঘোষণা দিয়েছেন।
এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান দৃঢ় অবস্থান নিয়ে দুই মিত্রদেশ বারবার উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে; এই চুক্তি সেই প্রেক্ষাপটে তাদের সর্বশেষ পদক্ষেপ।
জাপানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী শিনজিরো কোইজুমি বুধবার রাতে ফিলিপাইনের মধ্যাঞ্চলীয় সেবু প্রদেশে এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন। সেখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিরক্ষাপ্রধান ও তাদের প্রধান এশীয় ও পশ্চিমা সহযোগীদের বার্ষিক বৈঠকের ফাঁকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
কোইজুমি বৃহস্পতিবার জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে চীনের নৌ তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই সপ্তাহে তিনটি চীনা ধ্বংসকারী যুদ্ধজাহাজ ও একটি কোস্টগার্ড জাহাজ একসঙ্গে দক্ষিণের প্রধান দ্বীপ কিউশুর দক্ষিণে ওসুমি প্রণালি পেরিয়ে পূর্বদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের দিকে গেছে। তাঁর মন্ত্রণালয় এই ধরনের বহরবিন্যাস এবারই প্রথম শনাক্ত করেছে বলে তিনি জানান।
বৃহস্পতিবারের অধিবেশনে এই ঘটনাকে তিনি অঞ্চলের চ্যালেঞ্জিং নিরাপত্তা পরিবেশের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর মন্ত্রণালয় চীনের এই তৎপরতা গভীর আগ্রহ নিয়ে পর্যবেক্ষণ করে যাবে বলে তিনি জানিয়েছেন। চীনকে প্রতিহত করতে জাপান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করছে।
যৌথ এই উদ্যোগের নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন সুপারচার্জ’। কোইজুমি বলেন, এতে উৎপাদিত ক্ষেপণাস্ত্র এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের জন্য অপরিহার্য। দুই পক্ষ জাপানে অ্যাডভান্সড মিডিয়াম-রেঞ্জ এয়ার-টু-এয়ার মিসাইল বা এএমআরএএএমের চূড়ান্ত সংযোজন ও পরিদর্শন কারখানা নির্মাণে সম্মত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি এফ-৩৫ বিশ্বের অন্যতম উন্নত বিমান, জাপানি সামরিক বাহিনীও এটি ব্যবহার করে।
সেবুতে হেগসেথের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বৈঠকে কোইজুমি বলেন, ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠা আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি সংকটবোধ ভাগ করে নিয়েছেন এবং দুই পক্ষ জাপান-যুক্তরাষ্ট্র মৈত্রীর প্রতিরোধ ও জবাবদানের সক্ষমতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গতি ও তীব্রতায় শক্তিশালী করতে সম্মত হয়েছে।
কোইজুমি আরও বলেন, বলপ্রয়োগ, জবরদস্তি বা অন্য কোনো উপায়ে একতরফাভাবে স্থিতাবস্থা বদলের যেকোনো চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করে আইনের শাসনভিত্তিক মুক্ত ও উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলার গুরুত্ব পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে।
হেগসেথ বুধবার আসিয়ান প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন। ওই বৈঠকে নেতৃত্ব দেন আয়োজক ফিলিপাইনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী গিলবার্তো তেওদোরো জুনিয়র। নিরাপত্তা উদ্বেগ প্রকাশ করতে গিয়ে হেগসেথও কোইজুমির মতো চীনের নাম সরাসরি নেননি।
আসিয়ান প্রতিরক্ষাপ্রধানদের হেগসেথ বলেন, তাঁদের পদ্ধতি ‘শক্তিশালী, নিরব ও স্পষ্ট’ — এতটাই শক্তিশালী যাতে জবরদস্তি ও আগ্রাসন প্রতিহত হয়, এতটাই নিরব যাতে অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা এড়ানো যায়, এবং এতটাই স্পষ্ট যাতে বন্ধু, অংশীদার ও সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ ঠিকভাবে বুঝতে পারে যুক্তরাষ্ট্র কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
হেগসেথ ফিলিপাইনকে আশ্বস্ত করেছেন, বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ট্রাম্প প্রশাসন শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়বে। এশিয়ায় ফিলিপাইন ওয়াশিংটনের প্রাচীনতম চুক্তিবদ্ধ মিত্র। বেইজিং এই ব্যস্ত জলপথের প্রায় পুরোটাই নিজের বলে দাবি করে; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ।
অস্ট্রেলিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রিচার্ড মারলেস সেবুতে বলেন, দক্ষিণ চীন সাগরসহ চীনের ক্রমবর্ধমান দৃঢ়তার মধ্যেও তাঁর দেশের বাহিনী মিত্রদের সঙ্গে আইনের শাসন রক্ষায় প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। গত বছর বিতর্কিত জলসীমার ওপর দিয়ে ওড়ার সময় একটি চীনা জে-১৬ যুদ্ধবিমান অস্ট্রেলিয়ার পি-৮ পসাইডন নজরদারি বিমানের ৩০ মিটারের মধ্যে এসে ফ্লেয়ার ছোড়ার পর অস্ট্রেলিয়া প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
দক্ষিণ চীন সাগরে আসিয়ান সদস্য ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেই এবং তাইওয়ানের পরস্পরবিরোধী দাবি রয়েছে। বিশেষ করে বিতর্কিত প্রবালপ্রাচীর ও আশপাশের জলসীমায় চীনা ও ফিলিপাইন কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনীর জাহাজের মুখোমুখি অবস্থান বেড়েছে। ওয়াশিংটন সতর্ক করেছে, দক্ষিণ চীন সাগরসহ কোথাও ফিলিপাইন বাহিনী, জাহাজ বা বিমান সশস্ত্র হামলার শিকার হলে তাদের রক্ষা করা যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এর বাইরে পূর্ব চীন সাগরে জাপানের নিয়ন্ত্রণাধীন ছোট দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে বেইজিং ও টোকিওর আলাদা বিরোধ রয়েছে; দুই দেশই প্রায়ই পরস্পরের বিরুদ্ধে সমুদ্রসীমা লঙ্ঘনের অভিযোগ আনে।




