চার বছরের সর্বোচ্চে ইউরোপের জ্বালানি মূল্য: লুক্সেমবুর্গ সম্মেলনে সমাধানহীন মন্ত্রীরা, সামনে ‘কঠিন’ শীত
শীত আসার মুখে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি থেকে নাগরিকদের রক্ষা করতে ইউরোপের জ্বালানি মন্ত্রীরা যেন আইডিয়া খুঁজে পাচ্ছেন না। বৃহস্পতিবার লুক্সেমবুর্গে এক সম্মেলনে তাঁরা স্পষ্ট করেছেন একটি বিষয়ে—ভোটারদের বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে বলা কোনো বিকল্প নয়।
বুধবার ইউরোপে গ্যাসের দাম ২০২২ সালের পর প্রথমবারের মতো মেগাওয়াট-ঘণ্টাপ্রতি ১০০ ইউরো ছাড়িয়ে যায়। ইউরোপের গ্যাস মজুদ পূরণে শেষ মুহূর্তের হুড়োহুড়িতে কেনাকাটা বেড়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ-সংক্রান্ত সরবরাহ চাপ আরও বেড়েছে।
বৃহস্পতিবারের সম্মেলনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) জ্বালানি মন্ত্রীরা মোটামুটি স্বীকার করে নেন, মূল্য চাপ সামলাতে ব্রাসেলস ও জাতীয় রাজধানীগুলোর হাতে নতুন কোনো উপায় অবশিষ্ট নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় জ্বালানি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের স্বল্পমেয়াদি বিকল্পগুলোর বেশির ভাগই আমরা শেষ করে ফেলেছি। এখন যা বাকি, তা সত্যিকার অর্থে সংকট ব্যবস্থাপনা।’
গত এক বছরে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রকল্প, অপ্রত্যাশিত-মুনাফা কর (উইন্ডফল ট্যাক্স) ও ব্যয়বহুল জ্বালানি ভর্তুকি দিয়ে দাম আটকানোর সরকারি চেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে; উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে মহাদেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভে রূপ নেয়।
আয়ারল্যান্ডের জ্বালানি মন্ত্রী দারাঘ ও’ব্রায়েন, যাঁর সরকার ইইউর ছয় মাসের আবর্তনশীল সভাপতিত্বে রয়েছে, সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইইউ ও সদস্য রাষ্ট্রগুলোর হাতে দামের এই বৃদ্ধি উড়িয়ে দেওয়ার মতো কোনো জাদুর কাঠি নেই। স্বল্প মেয়াদে ইতিমধ্যে অনেক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আজকের আলোচনা হলো কীভাবে আমরা আরও টেকসই পদক্ষেপের দিকে যেতে পারি।’
তবে সংকট ব্যবস্থাপনাও রাজনৈতিকভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের শুরুতে ইইউর জ্বালানি প্রধান ড্যান ইয়র্গেনসেন ভোক্তা ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে জ্বালানি ব্যবহার কমাতে উৎসাহিত করার আহ্বান জানালেও ইউরোপের মন্ত্রীরা সেটিকে আনুষ্ঠানিক নীতি করতে রাজি নন।
ফিনল্যান্ডের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের রাষ্ট্র সচিব মিকা নুকানেন বলেন, ‘আমি চাই না আমরা মানুষকে সীমাবদ্ধ করি।’ তার বদলে তিনি এমন নীতির কথা বলেন, যা কম কষ্টে আচরণ বদলে জ্বালানি ব্যবহার কমাবে—যেমন বাড়ির জ্বালানি-দক্ষতা ও জানালায় বিনিয়োগে ভর্তুকি।
পোল্যান্ডের জ্বালানি-বিষয়ক রাষ্ট্র সচিব ভয়চেখ ভ্রোখনা সাংবাদিকদের বলেন, চাহিদা কমানোর প্রভাব পড়ে শিল্প ও ব্যবসার ওপর; কঠিন পরিস্থিতিতে তা একটি উপায় হতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। সুইডেনের জ্বালানি মন্ত্রী এব্বা বুশ বলেন, উচ্চ দাম নিজেই চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করবে।
চাহিদা কমানোর পদক্ষেপের বিরোধিতা এতটাই ছিল যে, সামনে জ্বালানি মূল্য বেড়ে যাওয়ার ‘কঠিন’ শীতের সতর্কতা দিতে সম্মেলনে আসা ইয়র্গেনসেন প্রস্তাবটি তোলাই বাদ দেন; তার বদলে তিনি ভর্তুকির দিকে মনোযোগ দেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তিনি মেনে নেন, সেই ভর্তুকি জীবাশ্ম জ্বালানিতেও হতে পারে—তবে তা হতে হবে ‘লক্ষ্যভিত্তিক ও সাময়িক’।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সরকারগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি পণ্যে কর ছাড় বাবদ ১৮ বিলিয়ন ইউরো দিয়েছে; এর মধ্যে চলতি মাসের শুরুতে রোমের বিতর্কিত পদক্ষেপও রয়েছে, যেখানে গ্যাসের দামের প্রভাব কমাতে বিদ্যুতের খরচ কমানো হয়।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লায়েন চলতি মাসের এক সম্মেলনে জাতীয় নেতাদের এই প্রবণতার বিরুদ্ধে সতর্ক করে পদক্ষেপগুলো সাময়িক ও লক্ষ্যভিত্তিক রাখার আহ্বান জানান, যাতে জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা অনিচ্ছাকৃতভাবে বেড়ে না যায় এবং ইইউর একক বাজার বিকৃত না হয়—তাঁর মন্তব্য সম্পর্কে অবগত দুই ইইউ কূটনীতিক এ তথ্য জানিয়েছেন।
এ নিয়ে ইইউ নেতাদের মধ্যে মতভেদ রয়ে গেছে। গ্রিসসহ কেউ কেউ জ্বালানি ভর্তুকি বাড়াতে আরও আর্থিক ছাড় চাইছেন; অন্যরা জীবাশ্ম জ্বালানিতে ভর্তুকির ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করছেন। লিথুয়ানিয়ার জ্বালানি মন্ত্রী লুকাস সাভিচকাস আলাদা এক সাক্ষাৎকারে বলেন, তাঁদের উদ্বেগ হলো সদস্য রাষ্ট্রগুলো যেন জাতীয় সিদ্ধান্তে খুব বেশি ভিন্ন দিকে না যায়—এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়।
চলতি মাসের সম্মেলনে তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর অপ্রত্যাশিত মুনাফার ওপর ইইউজুড়ে কর বসানোর দাবিও প্রত্যাখ্যান করেন ফন ডার লায়েন—যদিও শেল, টোটালএনার্জিস ও রেপসোলের মতো ইউরোপীয় কোম্পানিগুলো ২০২২ সালের পর সবচেয়ে বড় মুনাফা করছে।
জ্বালানি সরবরাহ সম্মিলিতভাবে কেনার কমিশনের প্রস্তাবের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সদস্য দেশগুলো। ভ্রোখনার ভাষ্য, তত্ত্বগতভাবে এমন ব্যবস্থা কাজ করতে পারে, তবে প্রতিষ্ঠিত সরবরাহ শৃঙ্খল থাকা ‘বড় খেলোয়াড়দের’ ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়ন কঠিন।
এর আগে চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্ল্যাকমেল’ হিসেবে বর্ণিত পরিস্থিতির জবাবে কৌশলগত অপরিশোধিত তেল ও ডিজেল মজুদ দ্রুত ছাড়ার ইইউর প্রতিশ্রুতিও জ্বালানির খরচ কমাতে তেমন কাজ করেনি। ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী রোলাঁ লেস্কুর বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের জানান, সেই প্রতিশ্রুতিতে এখন প্যারিসের প্রতিশ্রুত ১ কোটি ব্যারেলের পাশাপাশি আরও ৪ কোটি ব্যারেলের বেশি যুক্ত হবে।
তবে বিদ্যুতের দাম কমানো ও ভোক্তাদের আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসতে উৎসাহিত করার পদক্ষেপগুলো কাজ করতে শুরু করেছে; চলতি বছর ইউরোপে হিট পাম্প ও বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি ব্যাপক বেড়েছে। ইয়র্গেনসেন বলেন, ‘কোনো একক জাদুকরি সমাধান নেই, তবে সবগুলো মিলিয়ে যোগ হলে তা সত্যিই কাজ করতে পারে।’

