সাজা শেষের পরও যশোর কারাগারে বন্দি ৪৫ ভারতীয়, মর্গে পড়ে দুই বন্দির মরদেহ

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ৪৫ জন ভারতীয় নাগরিক সাজা শেষ হওয়ার পরও বন্দি রয়েছেন, কারণ প্রত্যাবাসনের অনুমোদন মিলছে না। একই কারাগারের দুই ভারতীয় বন্দির মরদেহ যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়।
কারাগারে বন্দি থাকা ভারতীয় নাগরিকদের একজন বাছুল মাঝি। ভারতের উত্তরপ্রদেশের চিতামারী জেলার মেজরগঞ্জ থানার কাঁকড়ারা গ্রামের বাসিন্দা তিনি। ২০১৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি খাগড়াছড়ির রামগড়ছড়ি সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের দায়ে তিনি আটক হন; পরদিন আদালত তাঁকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেন।
সাজা শেষ হলে নিজ দেশে প্রত্যাবাসনের সুবিধার্থে ২০১৮ সালের ২০ নভেম্বর তাঁকে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে স্থানান্তর করা হয়। এরপর সাজা শেষের পরও দীর্ঘ আট বছর এই কারাগারেই কাটে তাঁর। কারাগারে থাকা অবস্থায় তিনি সিজোফ্রেনিয়াসহ নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হন।
গত ৯ অক্টোবর হঠাৎ বুকে ব্যথা শুরু হলে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে দ্রুত যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যায়; সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত্যুর ২০ দিন পরও তাঁর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের বিষয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
বাছুল মাঝির মতো যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে আরেক ভারতীয় নাগরিক গাজী মণ্ডলের মরদেহ। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার মরুটিয়া থানার গান্ধীনা গ্রামের বাসিন্দা গাজী মণ্ডল অস্ত্র আইনের একটি মামলায় যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েদি ছিলেন। গত ১৯ অক্টোবর কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়; সেখানে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত মরদেহ দুটি মর্গে রাখা হয়েছে। যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক হুসাইন শাফায়াত বলেন, ‘হাসপাতালের মর্গে মরদেহ রাখার চারটি চেম্বার রয়েছে। এর মধ্যে একটি দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। বাকি তিনটির মধ্যে দুটি ভারতীয় বন্দির মরদেহ দখল করে আছে। ফাঁকা থাকা একটি চেম্বার নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে। অন্য মরদেহ রাখা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা কারা কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছি, যাতে মরদেহ দুটির বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হয়।’
কারা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, অনুপ্রবেশ, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত হয়ে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে ভারতীয় বন্দি রয়েছেন ৫২ জন। তাঁদের মধ্যে ৪৫ জনের সাজা শেষ হয়েছে, কিন্তু প্রত্যাবাসনের অনুমোদন না মেলায় তাঁরা এখনো কারাগারে বন্দি।
এসব বন্দির অনেকের সাজা ছিল ১৫ দিন থেকে দুই বছর পর্যন্ত। কিন্তু সাজা শেষ হওয়ার পরও তাঁদের আট থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাগারে থাকতে হচ্ছে। বন্দিদের অধিকাংশই বয়স্ক—তাঁদের মধ্যে সাতজন নারী এবং ২৪ জনের বয়স ৫০ বছরের বেশি।
এমনই একজন বিহারের দাউদপুর গ্রামের বাসিন্দা চারল দেবী। অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে ২০২৪ সালের ১২ জানুয়ারি শরীয়তপুরে আটক হন তিনি; আদালত তাঁকে আট মাসের কারাদণ্ড দেন। ওই বছরের ২ সেপ্টেম্বর সাজা শেষ হলেও তাঁর মুক্তি মেলেনি।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, ৪৮ বছর বয়সী চারল দেবী প্রায় সারাক্ষণ কাঁদেন। তাঁর ধারণা, যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রাচীরের ওপারেই ভারত; সেই প্রাচীর পার হতে পারলেই বিহারে নিজের বাড়ি ফিরে যেতে পারবেন। দুই বছর ধরে দেশে ফেরার অপেক্ষায় কাঁদতে কাঁদতে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে। তাঁর সঙ্গে থাকা এক নারী বন্দি জানান, চারল দেবীর স্বামীর নাম সন্তোষ ধরদ, শ্বশুরের নাম মিঠু তিওয়ারি; তাঁর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাপড়ের ব্যবসা করতেন তিনি; কীভাবে, কখন বাংলাদেশে চলে এসেছেন, তা তিনি জানেন না।
আরেক বন্দি গোবিন্দ বিহারী (৪৭) ২০১১ সালে অবৈধভাবে বাংলাদেশে প্রবেশের দায়ে আটক হন। আদালত তাঁকে এক বছরের কারাদণ্ড দেন। সাজা শেষ হলেও ১৪ বছর ধরে তিনি যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারেই বন্দি রয়েছেন।
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, ভারতীয় বন্দিদের পাসপোর্ট না থাকায় তাঁদের ফেরত পাঠাতে প্রথমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে প্রত্যাবাসনের অনুমোদন নেওয়া হয়; এরপর ভারতীয় হাইকমিশন বা সংশ্লিষ্ট ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এসব বন্দির অধিকাংশের প্রত্যাবাসনের অনুমোদন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া গেছে, কিন্তু ভারতীয় হাইকমিশন বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না মেলায় তাঁদের ফেরত পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না।
যশোরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলেন, ‘অধিকাংশ বন্দি বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে প্রত্যাবাসনের অনুমোদন পেয়েছেন। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না মেলায় তাঁদের মুক্তি সম্ভব হচ্ছে না। ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগও করা হয়েছে, তবে এখনো আশানুরূপ সাড়া পাওয়া যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, হাইকমিশনের মাধ্যমে ফেরত পাঠানো সম্ভব না হলে আদালতের মাধ্যমে ফেরত পাঠানোর বিকল্প ভাবনাও রয়েছে।
যশোরের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সাংস্কৃতিককর্মী আমিনুর রহমান হিরু বলেন, ‘সাজা শেষ হওয়ার পরও বছরের পর বছর বিপুলসংখ্যক ভারতীয় নাগরিকের জেলের ঘানি টানা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। মূলত আমাদের কূটনৈতিক দুর্বলতার কারণেই এমনটি ঘটে। এসব নাগরিককে তাঁদের স্বজনদের কাছে পৌঁছে দিতে দুই দেশের সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।’ যশোরের পাবলিক প্রসিকিউটর সাবেরুল হক সাবু বলেন, আসামি হস্তান্তরের জটিলতায় ৪৫ জন সাজা শেষের পরও মুক্তি পাননি; দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে এ সমস্যার দ্রুত সমাধান হতে পারে এবং মুক্তি পাওয়া তাঁদের মানবাধিকার।
মানবাধিকার সংগঠন রাইটস যশোরের নির্বাহী পরিচালক বিনয় কৃষ্ণ মল্লিক বলেন, ‘আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া যতই জটিল হোক, মানবিক বিবেচনায় এমন ঘটনার দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া জরুরি। তা ছাড়া মৃত্যুর পর মর্গে পড়ে থাকা মরদেহগুলোর মর্যাদাপূর্ণ শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার অধিকার আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার সঙ্গে সম্পর্কিত।’
কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় থাকা ৪৫ ভারতীয় বন্দির অধিকাংশই বয়স্ক এবং ২৪ জনের বয়স ৫০ বছরের বেশি; ফলে শারীরিক নানা রোগের পাশাপাশি তাঁদের মৃত্যুঝুঁকিও রয়েছে। বছরের পর বছর বন্দি থাকায় অনেকের মধ্যে মানসিক সমস্যাও দেখা দিয়েছে। জীবিত বন্দিদের থাকা-খাওয়ার পেছনে রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয় হচ্ছে, আবার কেউ মারা গেলে মরদেহ সংরক্ষণেও খরচ বাড়ছে—বছরখানেক আগে এক ভারতীয় বন্দির মৃত্যুর পর হাসপাতালের হিমঘরে মরদেহ রাখার ভাড়া বাবদ প্রায় এক লাখ টাকা ব্যয় হয়েছিল।




