গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে চড়া দামে সার বিক্রির অভিযোগ, মজুতে গরমিল

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ উঠেছে বিসিআইসি অনুমোদিত সার ডিলার তমাল চন্দ্র সাহার বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে সার মজুত ও বিতরণ রেজিস্টারে গরমিলের অভিযোগও উঠেছে। কৃষকদের অভিযোগ, সার মনিটরিং ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই এসব অনিয়ম ঘটছে। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকেরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার শোভাগঞ্জ বাজারে অবস্থিত মেসার্স তমাল চন্দ্র সাহার ডিলার পয়েন্টে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ সময় সার কিনতে আসা বেশ কয়েকজন কৃষককে দোকানের আশপাশে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাঁদের কেউ কেউ সকাল থেকেই সার সংগ্রহের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
অপেক্ষমাণ কৃষকদের অভিযোগ, সার নিতে গেলে ব্লক সুপারভাইজার (বিএস) ও ডিলারের লোকজন নানা অজুহাতে সার দিতে চান না। ফলে অনেক সময় সার না পেয়েই বাড়ি ফিরতে হয় তাঁদের। তবে বস্তাপ্রতি অতিরিক্ত ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দিলে চাহিদামতো সার পাওয়া যায়। এমনকি অতিরিক্ত টাকা দিলে স্লিপেরও প্রয়োজন হয় না বলে অভিযোগ তাঁদের।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, সার মনিটরিং ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাও ডিলার পয়েন্টে উপস্থিত থাকেন। তাঁর উপস্থিতিতেই এসব অনিয়ম ঘটছে বলে দাবি তাঁদের।
এ বিষয়ে কথা হয় সার নিতে আসা গংসার হাটের ব্যবসায়ী নয়া মিয়ার (৪৫) সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘দুপুর ১২টার দিকে সার নিতে গিয়েছিলাম। আরও আট-দশজন ব্যবসায়ী ছিলাম আমরা। ভ্যানে ভ্যানে সার যাচ্ছে। অথচ বিএস মিজান ওখানে নিজেই উপস্থিত। আমরা চাইলে খালি কয় শেষে নেন। পরে বিকেল ৪টার দিকে কয় সার আর নাই। পরে হিসাব করি দেখে কাগজ-কলমে সার আছে কিন্তু গোডাউনে সার নাই।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, ‘হিসাব করার সময় আমি সেখানে ছিলাম। হিসাবের সঙ্গে মজুতের গরমিল পাওয়া গেছে। সার বিক্রির পর স্টকে টিএসপির ৩৩ বস্তা এবং ডিএপির ৫৬ বস্তার গরমিল পাওয়া গেছে।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ক্ষুব্ধ এক কৃষক বলেন, ‘সরকারি দামে সার কিনতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। বলা হচ্ছে সার নেই। অথচ কৃষি কর্মকর্তার চোখের সামনেই অনেকে প্রতি বস্তায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দিয়ে সার নিয়ে যাচ্ছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দেখেও না দেখার ভান করছেন।’
অভিযোগের বিষয়ে ডিলার মনোনীত ম্যানেজার বিধু রঞ্জন (৪৫) বলেন, ‘অতিরিক্ত দামে কোনো সার বিক্রি করা হয়নি। কিছু সার মেমো করা হয়েছে, আবার কিছু সার মেমো ছাড়াই ঘর থেকে বের হয়ে গেছে। বিষয়গুলো আমরা বুঝতে পারিনি। এসব বিষয়ে কথা বলতেই কৃষি স্যার অফিসে ডেকেছেন। আমি সেখানেই আছি। ডিলার পয়েন্টে চণ্ডী দা আছেন। তাঁর কাছ থেকে জেনে নেন।’
পরে ডিলার পয়েন্টের পাশে অবস্থান করা ম্যানেজারের সহযোগী চণ্ডী দাসের সঙ্গে কথা হয়। অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘সেদিন সার বিক্রির সময় হরিলুট হয়েছে। কে কয় বস্তা নিয়ে গেছে, কিছুই বুঝতে পারিনি। এখনো অনেকে আমাদের টাকাপয়সাও দেয়নি। আমরা লোকসানে আছি। এ কারণে সারের হিসাব মেলাতে পারিনি।’ ডিলার তমাল চন্দ্র সাহা মোবাইল ফোনে অভিযোগের বিষয়গুলো শোনার পর বলেন, ‘আমার ডিলার পয়েন্টে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
সংশ্লিষ্ট ডিলার পয়েন্টের সার মনিটরিং ও সুষ্ঠু বণ্টন নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান মণ্ডল বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি কঞ্চিবাড়ী ইউনিয়নে কৃষি কার্ডের কাজে ছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে স্যার আমাকে ফোন করে ঘটনাস্থলে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে একটি ভ্যানে ১০ বস্তা সার দেখতে পাই। তখন ডিলারকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান, ওই সার দুজন কৃষকের।’ মজুত ও বিতরণ রেজিস্টারে কোনো গরমিল রয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গরমিলের বিষয়টি শুনেছি, তবে নিজে দেখিনি।’
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘বিষয়গুলো আমি শুনেছি। সংশ্লিষ্ট ডিলারের কাছে মজুত ও বিক্রির স্টক রেজিস্টার চেয়েছি। সার বিতরণে কোনো গরমিল রয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘অতিরিক্ত দামে সার বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। সারের মজুত, বিক্রি ও স্টক রেজিস্টারে গরমিলের বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত। বিষয়গুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



