ইসরায়েলের নির্বাচনে কাতার ও তুরস্কের গোপন অর্থায়নের অভিযোগ, তদন্ত শুরু করেছে শিন বেত
ইসরায়েলের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে কোনো জোটই সরকার গঠনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। এর মধ্যেই প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ আরব দলগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচন ‘চুরি’ এবং বিদেশি অর্থায়নের অভিযোগ তুলেছে, যেখানে কাতার ও তুরস্কের নাম উঠে এসেছে। দুই দেশই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের মোট আসন ১২০টি। সরকার গঠন করতে হলে কোনো দল বা জোটকে অন্তত ৬১টি আসনে জয় পেতে হয়। নির্বাচন কমিশনের ফলাফল অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি এবং সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের দল ইয়াশারের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থি জোট ৪৮টি আসনে জয় পেয়েছে। ফলে কোনো জোটই প্রয়োজনীয় সংখ্যায় পৌঁছাতে পারেনি।
এবারের নির্বাচনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন কট্টর ডানপন্থি জোট এবং আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে। ইসরায়েলি আরব দলগুলোও নির্বাচনে অংশ নিয়েছে, তবে নির্বাচনের সময় তারা এ দুই জোটের কোনোটিতেই যায়নি। নির্বাচনে আরব মুসলিম দুই দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম পার্টির উত্থান ঘটেছে বলে ফলাফলে দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার ভোটগণনা চলার সময় লিকুদ এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত গণমাধ্যমগুলো অভিযোগ তোলে, দুই ইসরায়েলি আরব দল জয়েন্ট লিস্ট এবং ইউনাইটেড আরব লিস্ট (রা’আম) নির্বাচন ‘চুরি’ করেছে এবং এই প্রক্রিয়ায় সম্ভবত বিদেশি সহায়তা ছিল। লিকুদের দাবি, কথিত হস্তক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল নেসেটের ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, ইসরায়েলকে ইসলামীকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া এবং ডানপন্থি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা।
লিকুদ পার্টি দাবি করেছে, কিছু এলাকায় রা’আম দলের ব্যালট পেপারের সঙ্গে খামের ভেতর নগদ অর্থ ভরে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া ভোটগ্রহণ কমিটির সদস্যদের হুমকি ও তাদের ওপর সহিংসতা, একাধিক ভোটারের একসঙ্গে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ, একই ব্যক্তির একাধিকবার ভোট দেওয়া এবং ব্যালট খামের সংখ্যার সঙ্গে নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যার অমিলের অভিযোগও আনা হয়েছে।
ভোটারদের সংগঠিত করতে নিষিদ্ধ সফটওয়্যার ব্যবহারের অভিযোগও এনেছে লিকুদ। তারা এই ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত দাবি করেছে এবং নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে অবিলম্বে জবাব চেয়েছে। লিকুদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছে, ‘রা’আম-গেট’ কেলেঙ্কারি একটি রাজনৈতিক ভূমিকম্পের মতো, ইসরায়েলের নির্বাচন চুরি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সপক্ষে কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেনি লিকুদ।
লিকুদ সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করলেও কিছু ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহুর দলের সদস্যরা কাতার ও তুরস্ককে এই হস্তক্ষেপের জন্য দায়ী করছেন। এমন অভিযোগও উঠেছে, রা’আম দল ভোট কেনার জন্য কাতার থেকে অর্থ পেয়েছে। চ্যানেল ১৩-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, অতীতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের জন্য ব্যবহৃত পথ যেমন মুদ্রা বিনিময়কারী প্রতিষ্ঠান বা স্থানীয় কোনো সংস্থার মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করা হয়েছে কি না। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ আরব মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ভোটদানের হার বাড়াতে ব্যবহার করা হয়েছে।
ভোট কারচুপির অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের সন্দেহে তদন্ত শুরু করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও সাবেক বিচারপতি নোয়াম সোলবার্গ একটি চিঠিতে তদন্তের আহ্বান জানানোর পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়। চিঠিতে সোলবার্গ লিখেছেন, ইসরায়েলের স্বার্থবিরোধী বাইরের পক্ষগুলোর অর্থায়নের মাধ্যমে নির্বাচনে অনৈতিক হস্তক্ষেপের গুরুতর অভিযোগ তাঁর কাছে এসেছে, তবে এসব অভিযোগ সত্য কি না সে সম্পর্কে তিনি এখনও নিশ্চিত নন।
অন্যদিকে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ডিন লিভনে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। কমিটির সদস্য ও ইয়েশ আতিদ দলের সংসদ সদস্য ভ্লাদিমির বেলিয়াককে লেখা চিঠিতে লিভনে জানান, নেসেট নির্বাচন আইন মেনেই অনুষ্ঠিত হয়েছে, ভোটকেন্দ্রগুলোতে নির্বাচনের স্বচ্ছতা কঠোরভাবে বজায় রাখা হয়েছিল এবং নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক অনিয়মের অভিযোগগুলোর কোনো ভিত্তি তাঁদের জানা মতে নেই।
নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোট বলেছেন, লিকুদ পার্টি নির্বাচনের ফলাফলকে অবৈধ প্রমাণের চেষ্টা করছে, কারণ তারা হেরে গেছে। তিনি আরও বলেন, নেতানিয়াহু মিথ্যাচার, জনমতকে প্রভাবিত করা এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে বাস্তবতা মোকাবিলা করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন এবং তিনি ও তাঁর সহযোগীরা ইসরায়েলি জনগণের ওপর অবৈধ প্রভাব বিস্তারের কার্যক্রম চালাচ্ছেন।
আরব দলগুলোও অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। জয়েন্ট লিস্টের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বিদেশি অর্থায়ন, সফটওয়্যার ব্যবহার ও ভোট কেনার অভিযোগ ভিত্তিহীন। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করা ডানপন্থি গোষ্ঠীগুলোর মিথ্যা ও ভিত্তিহীন অভিযোগের বিপরীতে ক্ষমা চাওয়া বা সাফাই গাওয়ার প্রয়োজন নেই এবং এসব বর্ণবাদী অভিযোগ প্রমাণ করে তারা আরব সম্প্রদায়ের শক্তিকে ভয় পায়। বিরোধী নেতা ইয়াইর গোলানও বলেছেন, নেতানিয়াহু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পরাজিত হয়েছেন, জনগণ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছে, অথচ তিনি ভোটারদের রায় মেনে নিতে অস্বীকার করছেন।
কাতারও ইসরায়েলের নির্বাচনে হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, কিছু ইসরায়েলি রাজনীতিকের রাজনৈতিক ব্যর্থতার জন্য কাতারকে যেন বলির পাঁঠা বানানো না হয়। মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেছেন, ইসরায়েলি নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করা কিংবা ফলাফল প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে কোনো কর্মকাণ্ডে অর্থায়নের অভিযোগ কাতার দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করছে। এক্সে তিনি লিখেছেন, কাতার আবারও অপপ্রচারমূলক প্রচারণা প্রত্যাখ্যান করছে, যার লক্ষ্য কাতারকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিরোধে টেনে আনা।
তুরস্কও ইসরায়েলি নির্বাচনে হস্তক্ষেপের দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলেছে। তুরস্কের যোগাযোগ অধিদপ্তরের অপপ্রচার মোকাবিলা কেন্দ্র এনসোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে জানিয়েছে, এসব অভিযোগ একটি সুপরিকল্পিত ও স্পষ্ট অপপ্রচারের অংশ, যার লক্ষ্য জনমতকে প্রভাবিত বা বিভ্রান্ত করা। কেন্দ্রটি জনগণকে বিভ্রান্ত করার উদ্দেশ্যে ছড়ানো মিথ্যা প্রতিবেদন ও অভিযোগে আস্থা না রাখার আহ্বানও জানিয়েছে।



